নিষিদ্ধ_প্রণয় পর্বঃ২০ সুমি আক্তার
নিষিদ্ধ_প্রণয়
পর্বঃ২০
সুমি আক্তার
হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে গেলো সময়। তুবার প্রেগনেন্সির এখন আট মাস চলে। চিকন চাকন দেহের গড়ন পরিবর্তন হয়ে তুবা এখন মুটু হয়ে গেছে। উঁচু পেটটা নিয়ে মেয়েটার চলাফেরা করা দায়। প্রেগনেন্সির পুরোটা সময় কৌশিক খুবই যত্ন নিয়েছে তুবার। মাঝে মাঝেই মিথ্যে বাহানা দেখিয়ে অফিস মিস দেয়। যতটা সম্ভব চেষ্টা করে তুবার কাছাকাছি থাকার। প্রতিদিন নিয়ম করে তুবাকে খাইয়ে দেয়া। গোসল করিয়ে দেয়া। চুল বেঁধে দেয়া। এগুলো যেনো কৌশিকের একার দায়িত্ব। বউ বাচ্চার দেখাশোনায় সে অন্য কাউকে হাত লাগাতে দেয় না।
এরই মাঝে তুবার ইন্টার ফাইনাল এক্সাম শুরু হয়ে গেছে। আজ পরিক্ষার প্রথমদিন। শারিরীক এই বেহাল অবস্থায় মেয়েটা পরিক্ষা দেবে কিভাবে? এই ভাবনাতেই অস্থির পুরো পরিবার।
ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজে। দশটায় পরিক্ষা শুরু। তুবা বিছানার সাথে হেলান দিয়ে আধো শোয়া হয়ে বসে আছে। হাতে বই। যদিও সব পড়া আগে থেকেই আয়ত্ত করে ফেলেছে। তবুও শেষবারের মতো প্রতিটা পাতায় নজর বুলিয়ে যাচ্ছে। কৌশিক নিচে গেছিলো কোনো একটা কাজে। ফিরে এলো এই মাত্রই। ঘরে ঢুকেই সোজা তুবার কাছে চলে গেলো। আস্তে করে বইটা নিয়ে পাশের টেবিলে রেখে দিলো। মোটা কন্ঠে বললো,
"অনেক পড়েছিস। আর পড়া লাগবে না। এতো পড়লে শেষে সব গুলিয়ে যাবে।"
তুবা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলালো। ওর মুখের ভাব ভঙ্গি দেখে হেসে ফেললো কৌশিক। সাবধানে বিছানায় উঠে তুবার দিকে ঝুঁকে বুকে ভর দিয়ে শুয়ে পড়লো। তুবার পাহাড় সমান ফুলো পেটে আলতো করে দুই হাত রাখলো। পুরুষালী ঠোঁটের আলতো ছোঁয়ায় ছোট্ট করে চুমু খেলো। এরপর পেটের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কেমন আছে আমার পাপাটা? ঘুম ভেঙেছে?"
সঙ্গে সঙ্গে পেটের ভেতর জোরেশোরে নড়ে উঠলো। পেটের চামরা ভেদ করে ছোট্ট একটা পায়ের ছাপ ভেসে উঠলো। প্রথম অবস্থায় চমকে উঠলো কৌশিক। কিন্তু পরপরই শব্দ করে হেঁসে ফেললো। বাপের সাথে বাচ্চার ভালোই একটা কানেকশন আছে। এই যেমন, কৌশিক নিয়ম করে সকাল এবং রাতে দুই বেলা পেটে চুমু খাবে। ফুলো পেটের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে আলাপ আলোচনা করবে। সেই গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনায় অংশগ্রহন করার চিহ্ন হিসেবে সে ছোট ছোট পায়ের ছাপ মায়ের পেটে বসিয়ে দেবে। আর এই দুজনের পাগলামো চুপচাপ বসে বসে দেখবে তুবা। এটাই তার দৈনন্দিন রুটিন।
বেশ কিছুক্ষণ নিজের অনাগত বাচ্চার সাথে আলাপচারিতা শেষে উঠে বসলো কৌশিক। তুবার পাশে গিয়ে গা ঘেঁষে বসলো। এক হাতের আলিঙ্গনে বুকে জড়িয়ে ধরলো। অন্য হাতে তুবার মুখটা আলতো করে ধরে বলল,
"এখন শরীর কেমন লাগছে জান?"
"ভালো।"
"বমি পাচ্ছে কি?"
"ওই একটু একটু।"
"পরিক্ষা দিতে পারবি? বেশি খারাপ লাগলে থাক। পরিক্ষা নাহয় সামনের বছর দিবি।"
তুবা বিরোধিতা করলো। আঁতকে উঠে বলল,
"একদম না। আমি মোটেও এক বছর গ্যাপ দিতে রাজি নই।"
কৌশিক হতাশ হলো। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তুবার কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলো। নরম ওষ্ঠে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। তুবা হাসলো৷ হেসে কৌশিককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা কৌশিকের বুকে। তুবা আলতো হাতে তর্জনী আঙ্গুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কৌশিকের বুকে আঁকিবুঁকি করতে লাগলো। ঠিক সেই সময় শোনা গেলো কনকচাঁপা বেগমের হাঁকডাক,
"কৌশিক! তুবাকে নিয়ে নিচে আয়। খাবার রেডি।"
কৌশিক আর বসে থাকলো না। অতি সপ্তপর্ণে তুবাকে কোলে তুলে নিলো। যদিও বর্তমানে তুবার ওজন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। তবুও কৌশিক অনায়াসে নিজের বাহুডোরে আঁকড়ে নিলো। তুবা দুই হাতে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরলো। কোনো বিরোধিতা করলো না। কারণ তুবা জানে কৌশিককে বারন করে লাভ নেই। এই বিষয়ে সে কোনো বারন শুনবে না। তাই অগত্যাই চুপচাপ পড়ে রইলো কৌশিকের বাহুডোরে।
-
-
ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত। নীরবও একেবারে তৈরি হয়ে এসে বসেছে। কৌশিক সবার শেষে তুবাকে নিয়ে নিচে নামলো। একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজে পাশের চেয়ার টেনে বসলো। এরপর নিজ হাতে তুবাকে খাইয়ে দিলো। এটা যেনো আজকাল তুবার জীবনের দৈনন্দিন রুটিন। প্রতিদিন দুই বেলা কৌশিক তুবাকে নিজ হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। দুপুরের একবেলা মিস হয়ে যায় কৌশিকের অফিসে থাকার কারণে। শুরুর দিকে তুবার ভিষণ লজ্জা লাগলেও এখন যেনো এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পরিবারের বাকিরাও বিষয়টা এখন স্বাভাবিক নজরে দেখে। জামাল সাহেবও এখন ছেলেকে খোঁচানো কমিয়ে দিয়েছেন। বয়স হচ্ছে তার। কিছুদিন পর দাদু হয়ে যাবেন। এখন কি আর খোঁচাখুঁচির মানায়?
খাওয়া দাওয়ার মাঝেই বাড়ির কর্তারা তুবা এবং নীরবকে ভালো মন্দ পরামর্শ দিলেন। পরিক্ষার হলে বিচলিত হতে বারন করলেন। ঠান্ডা মাথায় সবকিছু লেখার পরামর্শ দিলেন। সেই সাথে কি কি করতে হবে এবং কি কি করা যাবে না সেবিষয়ে লম্বা বক্তব্য দিলেন। বাড়ির রমনীরা ছেলে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন। সবকিছুই কমপ্লিট। এখন শুধু পরিক্ষার হলে গিয়ে হল ফাটিয়ে দেয়া বাকি। অতঃপর খাওয়া দাওয়া শেষে সবার থেকে বিদায় নিয়ে তুবা, কৌশিক এবং নীরব বেরিয়ে পড়লো পরিক্ষার হলেও উদ্দেশ্যে।
-
-
পরিক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় আধা ঘণ্টা। রিমি আগে থেকেই তুবার জন্য অপেক্ষা করছিল। তুবাকে আসতে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে গেলো। কিন্তু পাশেই নীরবকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে মুখের হাসিটা উধাও হয়ে গেলো রিমির। সেই ঘটনার পর বেশ লম্বা সময় কেটে গেছে। নীরবের হুমকিতে রিমি লিস্টের সবগুলো ছেলেকে ব্লক করে দিয়েছে। নতুন করে আর কারোর সাথে ফ্লার্টিং করার সাহসও পায়নি। নীরব সবসময় রিমিকে চোখে চোখে রাখে। সেদিনের পর কখনো রিমিকে ভালোবাসার জন্য জোর করেনি নীরব। কিন্তু অন্য কারোর আশেপাশে ঘেঁষতেও দেয় না। মাঝে একবার রিমি চেষ্টা করেছিল। সেদিন নীবর কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে,
"আমার ভালোবাসা এক্সেপ্ট করছিস না। বেশ! করিস না। কিন্তু তুই আমার না মানে অন্য কারোরও না।"
নীরবের চোখে সেদিন ছিলো জলন্ত আগুন। রিমি তারপর থেকে সকল চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে। যদিও সে শুরুতে নীরবকে বন্ধু ব্যাতিত বিশেষ কোনো নজরে দেখতো না। কিন্তু এই কয়েক মাসে নীরবের আশেপাশে থাকায় রিমিরও মন পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। তবে সেটা নীরবের সামনে একদমই প্রকাশ করেনি। কেনো করবে? বেয়াদবটার শাস্তি প্রাপ্য। ওর শাস্তি এখনও শেষ হয়নি।
এরই মাঝে সবাই মিলে পরিক্ষার হলে ঢুকে পড়েছে। তুবাকে এক হাতে আগলে ধরে রুম পর্যন্ত নিয়ে আসলো কৌশিক। এতটা সাবধানে যেনে তুবার সামান্যতম কষ্ট না হয়। তিনজনকে জায়গা মতো বসিয়ে দিয়ে তুবার কাছে গিয়ে বসলো কৌশিক। এতটুকু হাটাতেই হাঁপিয়ে উঠেছে মেয়েটা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শ্বাসটাও টেনে টেনে নিচ্ছে। কৌশিক চিন্তিত চেহারায় পকেট থেকে রুমাল বের করে তুবার কপালের ঘাম মুছে দিলো। পানির বোতলের মুখ খুলে তুবার মুখের সামনে ধরলো। কয়েক ঢোক পানি খেয়ে বোতলটা রেখে দিলে তুবা। কৌশিক বিচলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"খারাপ লাগছে জান?"
তুবা উপর নিচ মাথা দোলালো। ক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিলো কৌশিকের ওপর। কৌশিক দৃঢ় বন্ধনে আগলে নিলো। মাথায় ঘনঘন হাত বুলিয়ে দিলো। কন্ঠে বেজায় চিন্তা,
"বেশি খারাপ লাগলে চল বাড়ি ফিরে যাই।"
"উঁহু। আমি পরিক্ষা দেবো।"
জেদি স্বরে বললো তুবা। কৌশিক হতাশ হলো। ইতিমধ্যে ঘন্টা বেজে গেছে। পরিক্ষার্থী ব্যাতিত একে একে বাকি সবাই বেরিয়ে গেলো। কৌশিক ক্লান্তের ন্যায়ে উঠে দাঁড়ালো। যাওয়ার আগে তুবাকে স্পষ্ট করে বলল,
"আমি বাহিরেই আছি। খারাপ লাগলে আমাকে ডাকবি।"
তুবা মাথা নাড়লো। কৌশিক আবারও বলল,
"পানির বোতল রেখে গেলাম। গরম লাগলে পানি খাবি। পানি শেষ হয়ে গেলে আমাকে ডাকবি।"
"আচ্ছা।"
"বমি পেলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাক দিবি।"
"আচ্ছা।"
"মাথা ঘুরলেও আমাকে ডাকবি।"
"আচ্ছা বাবা ডাকবো। আমার কাশি আসলেও ডাবো। এখন যান তো।"
তুবা অধৈর্য্য সুরে বললো। কৌশিক দড়জার দিকে এগিয়ে গেলো। হলের ডিউটিরত শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে বলল,
"স্যার! ওই যে চার নাম্বার বেঞ্চে যে সুন্দরী মেয়েটা বসে আছে। ও আমার ওয়াইফ। আসলে ও প্রেগনেন্ট। একটু খেয়াল রাখবেন প্লিজ।"
ভদ্রলোক চশমা চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। এরপর অভয় দিয়ে বললেন,
"ঠিক আছে! খেয়াল রাখবো। আপনি প্লিজ ক্লাসের বাইরে যান।"
কৌশিক একটু থামলো। এরপর নিরুপায় ভঙ্গিতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো। কিন্তু চিন্তা মুক্ত হতে পারলো না এক বিন্দুও। বরং ক্লাস থেকে বের হতেই দুশ্চিন্তা বহুগুণ বেড়ে গেলো। ভেতরে তুবা একা আছে। যদি ওর বেশি খারাপ লাগে? যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে? তখন কি হবে? ভাবতেই বুকটা মুচড়ে উঠলো কৌশিকের। সে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে ছুটলো প্রিন্সিপালের রুমের দিকে।
-
-
পরিক্ষা শুরু হয়েছে সবে দশ মিনিট হচ্ছে। এরই মাঝে কৌশিক ক্লাসের সামনে এসে হাজির। সাথে প্রিন্সিপাল স্যারও এসেছেন। দুজনে একসাথে ক্লাসরুমে প্রবেশ করলো। প্রিন্সিপাল স্যার ডিউটিতে থাকা শিক্ষকদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
"ছেলেটা পাগল করে দিচ্ছে আমাকে। ওকে কোথাও একটা বসার জায়গা করে দিন প্লিজ। আমি অনুমতি দিচ্ছি। কৌশিক আমার বন্ধুর ছেলে।"
ক্লাস টিচারেরা আর দ্বিমত করার সুযোগ পেলেন না। চারজন টিচারের মধ্যে থেকে একজন একদম শেষের একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বললেন,
"আপনি এটাতে বসতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন। স্টুডেন্টদের যেনো সমস্যা না হয়।"
কৌশিক প্রসস্ত হাসলো। ধপ করে গিয়ে পিছনের বেঞ্চে বসে পড়লো। মনের খুঁতখুঁতানি এবার অনেকটা কমেছে।
-
-
ঘড়িতে টিক টিক শব্দে সময় পার হচ্ছে। ক্লাসে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থী যার যার মতো লেখায় ব্যাস্ত। পুরো ক্লাসরুম জুড়ে কলমের খসখস আওয়াজ ব্যাতিত আর কোনো শব্দ নেই। ইতিমধ্যে পরিক্ষার এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। এই এক ঘন্টায় কৌশিক চারবার উঠে এসে তুবাকে পানি খাইয়ে দিয়ে গেছে। দুবার চোখে মুখে পানির ছেটা দিয়ে গেছে। বারে বারে উঠে এসে জিজ্ঞেস করছে খারাপ লাগছে কি না। শেষে বিরক্ত হয়ে ক্লাস টিচার তুবাকে উঠিয়ে পেছনে পাঠিয়ে দিয়েছে। এবার দুজনে পাশাপাশি। তুবা বেঞ্চের এক কোণে বসে লিখছে। আর কৌশিক একই বেঞ্চের অপর প্রান্তে। একজন শিক্ষক অনবরত ওদের আগে পিছে পুলিশের মতো টহল দিচ্ছে। তুবা হতাশ হলো। নিজের হাতে কপাল চাপড়ালো। মানুষ বউকে ভালোবাসে, তাই বলে এতো? এই পাগলামির জন্য বাড়ি গিয়ে কৌশিক নিশ্চিত জামাল সাহেবের বকা খাবে। প্রিন্সিপাল স্যার অবশ্যই এতোক্ষণে জামাল সাহেবকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন তার ছেলের কান্ড কারখানা। বাড়ি ফিরে আরও একবার তর্ক বিতর্ক হবে বাপ ছেলের মধ্যে। ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে এলো তুবার। বেচারির পরিক্ষা দিয়েও শান্তি নেই। কৌশিকের এই অতি ভক্তি, মেয়েটার রেজাল্টের নাম্বার চুরি করেই ছাড়বে।
চলবে?
