নিমপাতার_ভালোবাসা সুমি আক্তার পর্ব:-০৯


 

নিমপাতার_ভালোবাসা 

পর্ব:-০৯
রাফা হাসপাতাল থেকে হোস্টেলে ফিরে এসে বোরকা খুলে কম চাল নিয়ে ভাত বসাচ্ছিল, মনে মনে ভাবছিল, "আজকে অনেক কষ্টে দিনটা শেষ করতে হবে, তাই অল্প ভাতেই দিন চলে যাবে।" কিন্তু ঠিক তখনই রাইসা এসে রাফাকে জড়িয়ে ধরে বলে, "আজকে তোর সাথে আমার কয়টা ভাত একটু রান্না করে খাওয়াবি? আমার মাথা ব্যথা করছে, খুব খারাপ লাগছে।"

রাইসা রাফার কাছে গিয়ে পট থেকে চাল, বেগুন, ডিম, পিঁয়াজ, মরিচ বের করে বলে, "তোর ওই স্পেশাল বেগুন ভর্তা কর, আর ভাত রান্না কর। আজকে আমার খুব খারাপ লাগছে, তুই একটু ভালো করে রান্না করে খাওয়ালে ভালো হবে।"

রাফা মুচকি হেসে, "ঠিক আছে, রাইসা। তুই একটু বিশ্রাম নে, আমি তোর পছন্দের বেগুন ভর্তা আর ভাত তৈরি করছি।"

রাইসার আবদার শুনে আঁখি আর মাহিও পট থেকে চাল ও বেগুন নিয়ে এসে বলল, "আমাদেরও শরীর ভালো না, একটু রান্না করে খাওয়াবি? আমরা তো তোর হাতের রান্না খুব পছন্দ করি।"

রাফা একটু চমকিত হয়ে বলল, "কি পাইছিস তোরা? আমাকে সবাই বলল তোর হাতের রান্না করবো, কিন্তু এখন তো আমি একা কীভাবে এত রান্না করব?"

আঁখি বলল ," একটা ছোটখাটো পিকনিক হয়ে যাবে আমি তোকে পিঁয়াজ বেগুন কেটে দিবো "

এতটুকু শুনে রাফা মুচকি হেসে বলল, "ঠিক আছে, 

রাফা তারপর তাদের জন্য বিশেষভাবে রান্না করতে শুরু করে দিলো, 

রাফা রান্নাঘরে চলে যাওয়ার পর রাইসা, আঁখি আর মাহি একে অপরের দিকে তাকাল। রাইসা গম্ভীর মুখে বলল,

"আমি যা করছি, তোরা কি জেনে বুঝে করছোস?"

মাহি একটু হাসল, তারপর বলল, "হুম, আমি খেল করছি কিছু ধরে। রাফা তো সবসময় কম ভাত আর তরকারি খায় না, নিজের জন্য কিছু রাখতেই চায় না সব টাকা ওই তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় শুধু খাওয়ার টাকা ছাড়া। তাই ইচ্ছে করেই আমরা সবাই ওর কাছে এসে বললাম আমাদের জন্য রান্না করুক, যাতে বাধ্য হয়ে নিজেও ভালো করে খায়।"

আঁখি মাথা নাড়িয়ে বলল, "আমিও! ও তো আমাদের ফ্রেন্ড। কিন্তু নিজের যত্ন নেয় না একদম। আমরা যদি ওকে না দেখি, তাহলে আর কে দেখবে?"

রাইসা মুচকি হেসে বলল, "সঠিক! আজ ওকে জোর করে হলেও ঠিক মতো খাওয়াবো।"

তারা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বন্ধুত্বের এমন সুন্দর এক বোঝাপড়ার মাঝে যেন আরও শক্ত হয়ে গেল তাদের বন্ধন। রান্নার কাজ প্রায় শেষের দিকে, তখনই আঁখি রাফার কাছে এসে বলল, "আমাকে তুই তোর এই স্পেশাল বেগুন ভর্তা শিখাবি।"

রাফা হাতের কাজ থামিয়ে তাকিয়ে বলল, "শিখবি? তাহলে আগে ডিম সিদ্ধ দিয়ে আয়।"

আঁখি মাথা নেড়ে বলল, "হুম, শিখবো! আমি করছি, তুই দেখ।"

রাফা মুচকি হেসে বলল, "ঠিক আছে, তবে সাবধানে করিস, বেশি সিদ্ধ করিস না, না জানি ভিতরে কাঁচা থাকে । আর বেগুন ভাজার 

সময় খেয়াল রাখবি যেন বেশি পুড়ে না যায়।"

আঁখি মন দিয়ে শুনতে শুনতে কাজ করতে লাগল। রাইসা আর মাহি পাশ থেকে হাসছিল, "দেখতে দেখতে রান্না শিখেও ফেললি, আঁখি!"

আঁখি ঠোঁট উল্টে বলল, "শুধু শিখছি না, এখন থেকে মাঝেমধ্যে আমিই রাঁধবো, বুঝলি?"

রাফা হেসে মাথা নাড়ল, "ঠিক আছে, দেখি কতদূর পারিস!"

আঁখি মন দিয়ে ডিম সিদ্ধ করছিল, আর রাফা পাশে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছিল।

রাফা বলল, "এবার বেগুনগুলো ভালো করে ভাজ। ভালোভাবে ভাজা হলে তবেই স্বাদ আসবে।"

আঁখি মাথা নাড়িয়ে বেগুনগুলো উল্টে পাল্টে ভাজতে লাগল। বেগুন যখন সুন্দরভাবে নরম আর ভাজা হয়ে গেল, তখন রাফা বলল, "এখন পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচ দিয়ে দে। তারপর বেগুনগুলো ভালো করে ভেঙে নে, যেন সব মিশে যায়।"

আঁখি ধীরে ধীরে বেগুন চামুচ দিয়ে চটকাতে লাগল, আর পেঁয়াজ-মরিচের গন্ধে রান্নাঘর ভরে গেল।

রাফা এবার বলল, "এখন সিদ্ধ ডিমগুলো দিয়ে ভালোভাবে মেশা। তারপর স্বাদ অনুযায়ী লবণ দিয়ে আরেকটু ভাজ, তাহলেই হয়ে যাবে মজাদার বেগুন-ডিম ভর্তা!"

আঁখি রান্না শেষ করে খুশি মনে বলল, "আহা! দেখে তো মনে হচ্ছে একদম তোর হাতের মতোই হয়েছে!"

রাইসা পাশ থেকে বলল, "দেখে যেমন, খেতেও তেমন হয়েছে কিনা আগে খেয়ে দেখি!"

মাহি চামচ নিয়ে সামনে এগিয়ে এল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, প্রথম টেস্ট আমার!"

রাফা তাদের খুনসুটি দেখে হেসে ফেলল। বন্ধুত্বের এমন মুহূর্তগুলোই ছিল তাদের প্রতিদিনের সাধারণ কিন্তু মূল্যবান স্মৃতি!

পাশের রুমের মেয়ে হঠাৎ উঁকি দিয়ে বলল, "তোমাদের মিল দেখতে খুব ভালো লাগে! আমাদের রুমমেটদের সাথে তো কারও কোনো মিলই নেই। ইস! যদি তোমাদের সাথে পড়তাম!"

রাইসা হাসতে হাসতে বলল, "আরে, আমরা তো একসাথে থাকতেই এত মিল হয়ে গেছে! তোদের রুমে একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু সম্পর্ক ভালো করা যায়।"

মাহি চোখ টিপে বলল, "হ্যাঁ, আগে তোকে আমাদের দলে নিতে হলে ভর্তি ফরম পূরণ করতে হবে!"

মেয়েটা হেসে বলল, "তা হলে ফরম দে, আজকেই ভর্তি হয়ে যাই!"

রাফা মুচকি হেসে বলল, "আসল বন্ধুত্ব মানে হলো একে অপরের খেয়াল রাখা। তোরা যদি নিজেদের রুমে একে অপরের দিকে একটু বেশি যত্ন নেওয়া শুরু করিস, দেখবি, তোরাও আমাদের মতো হয়ে যাবি!"

মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল, "সত্যি বলছিস?"

আঁখি বলল, "অবশ্যই! এখন যা, তোর রুমমেটদের নিয়ে আয়, আজ সবাই মিলে একসাথে খাবো!"

মেয়েটা খুশিতে ছুটে গেল, আর বাকিরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। বন্ধুত্বের এমন ছোট ছোট মুহূর্তই ওদের জীবনটাকে সুন্দর করে তুলছিল!

---
ঈশান ধূসর রঙের টিশার্ট পরে, কালো টাওয়ালে গা মুছতে মুছতে বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছিল। আজকের রাতটা তাকে বেশ নিরিবিলি আর গভীর মনে হচ্ছিল। চারপাশে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে।

সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এই নীরবতার কারণ হলো পাশের রুম থেকে আজ গিটারের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে না। প্রতিদিনই সেই বাজনার আওয়াজ তার রাতের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল, অথচ আজ যেন শূন্যতা লাগছে।

ঠিক তখনই দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। ঈশান মাথা তুলে তাকাল। দরজার ওপাশ থেকে রোহানের কণ্ঠ ভেসে এলো, "আসবো ভাই?"

ঈশান এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বই বন্ধ করল, তারপর ধীর কণ্ঠে বলল, "আয়।"

রোহান দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, চোখে একটা অদ্ভুত ভাব। ঈশান তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আজকের রাত শুধু নীরব না, আজকের রাতের মাঝে কিছু না বলা কথাও লুকিয়ে আছে।

রোহান ভেতরে ঢুকেই একরকম হতাশ কণ্ঠে বলল, "আমারও ভালো লাগছে না রায়ান ভাইয়ের গান না শুনে।"

ঈশান বই বন্ধ করে রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাইয়া কই গেছে?"

রোহান একটু ধীরে উত্তর দিল, "ব্যবসার কাজে সিলেট গেছে মনে হয়। আবির ভাইও কিছু বলল না, আমি সকালে শুনলাম বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে।"

ঈশান একটু চুপ করে রোহানের কথাগুলো বিশ্লেষণ করল। রায়ান খুব একটা কোথাও যায় না, বিশেষ করে কাউকে কিছু না জানিয়ে। তার ব্যবসার কাজ থাকলেও সাধারণত আগেভাগেই জানিয়ে যায়। কিন্তু এবার যেন হঠাৎ করেই চলে গেছে।

রোহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "রাতটা কেমন ফাঁকা লাগছে, তাই না?"

ঈশান হালকা মাথা নাড়ল, "হুম… একটু বেশি চুপচাপ।"

নীরবতার মাঝেও যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি লুকিয়ে ছিল। রায়ানের এই অপ্রত্যাশিত অনুপস্থিতি কী শুধু ব্যবসার কাজ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? ঈশান ভাবছে --
ঈশান গভীর দৃষ্টিতে রোহানের দিকে তাকিয়ে বলল, "ভাইয়ার এই কষ্টের গান কি এখনো এশা আপুর জন্য? সে কি এখনো এশা আপুর জন্য অপেক্ষা করে?"

রোহান একটু চিন্তিত মুখে বলল, "তা জানি না ভাইয়া অপেক্ষা করে কি না, কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত জানি—প্রতি রাতেই সে তাকে উৎসর্গ করে গান গায়।"

ঈশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "আমার মনে হয়, ভাইয়া যতক্ষণ পর্যন্ত সরাসরি প্রমাণ না পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুভ অন হতে পারবে না।"

রোহান চুপচাপ ঈশানের কথা শুনছিল। ঈশান আরও বলল, "আর যদি সত্যিই এশা আপু তাকে ভুলে গিয়ে অন্য জীবনে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে ভাইয়ার জন্য মুভ অন করাটা ভালোই হবে। নতুন জীবন শুরু করতে পারবে। এটা খারাপ না, বরং ওর জন্যই ভালো।"

রোহান ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, "কিন্তু এই কথা কি ভাইয়াকে বোঝানো সম্ভব? ওর চোখে এখনো একটা প্রশ্ন জমে আছে, যার উত্তর সে খুঁজে পায়নি।"

ঈশান চুপ করে গেল। সে জানত, রায়ান যুক্তি দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে বাঁচে। যতক্ষণ না সে নিজে নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ তার এই অপেক্ষার শেষ হবে না।

ঈশান রোহানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "এশা আপুর কোনো খবর আছে তোর কাছে?"

রোহান একটু থেমে গিয়ে বলল, "আরো এক বছর আগে শুনেছিলাম, ইউএসে কোনো ছেলের সঙ্গে আছে, একসাথে... কিন্তু এখন বলতে পারি না, সত্যি কি না।"

ঈশান গভীরভাবে চিন্তা করল। এক বছর আগে শোনা কথা মানেই নিশ্চিত কিছু না। হয়তো গুজব, হয়তো সত্যি। কিন্তু রায়ান যে এখনো অপেক্ষা করছে, সেটা ঈশান জানে।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাইয়া যদি সরাসরি জানতে পারে, তাহলে হয়তো শেষ আশা ছেড়ে দেবে। ততদিন পর্যন্ত সে মুক্ত হতে পারবে না।"

রোহান মাথা নিচু করল, "তুই কি মনে করিস, আমরা এটা জানানো দরকার?"

রাতের নীরবতা আরও গভীর হয়ে গেল, যেন কারো না বলা কষ্টের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠছে।

ঈশান ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল, "আমাদের কিছু বলতে হবে না, বাস্তবতা আর পরিস্থিতিই একদিন ভাইয়াকে সব বলে দেবে।"

রোহান এক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, "হুম, হয়তো ঠিকই বলেছিস। আমরা কিছু বললেও, ভাইয়া বিশ্বাস করবে কি না, সেটা তো ওর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যখন সত্যিটা নিজেই সামনে আসবে, তখন হয়তো ও নিজেকে সামলাতে পারবে।"

রোহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "শুধু চাই, সত্যিটা জানার পর ভাইয়া যেন ভেঙে না পড়ে। ও আসলেই অনেক কষ্টের মধ্যে আছে, ঈশান।"

ঈশান ঠোঁট চেপে ধরল, চোখে একরাশ চিন্তার ছায়া। রায়ান কি আসলেই প্রস্তুত সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য? সে জানে না, কিন্তু এতদিনের দুঃখ হয়তো এবার শেষ হতে চলেছে—ভালো হোক বা খারাপ, একটা সমাপ্তি আসবেই।
---
সিলেট জেলা মানেই সৃষ্টিতার সৃষ্টি সুন্দরতম ছোট নিদর্শন ! অপূর্ব সবুজে মোড়ানো পাহাড়, বয়ে চলা নীলচে নদী, চা বাগানের মোহময়ী সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে সিলেট যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি।

জাফলং-এ দাঁড়িয়ে মেঘ ছোঁয়ার অনুভূতি, ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর-এর সাদা রাজ্য, পান্থুমাই ঝরনা-র হৃদয়জুড়ানো রূপ—এসবই সিলেটকে এনে দেয় এক স্বপ্নিল সৌন্দর্য। রাতারগুলের জলাবন আর লালাখাল নদীর ফিরোজা জল যেন রূপকথার জগৎ থেকে উঠে আসা।

রায়ান বহুদিন পর মীরপুর গ্রামে এসেছে, নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে!

মীরপুর গ্রামটি সিলেটের গ্রামীণ পরিবেশে ঘেরা, যেখানে সবুজ মাঠ, ছোট ছোট মাটির ও পাকা বাড়ি, আর সরল মানুষদের দেখা মেলে।  কিছু খুঁজতে এসেছে, যা তার অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
রায়ান আজমল স্যারের খোঁজে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিল,

— "স্যার, বাড়িতে আছেন?"

তার ভেতরটা কেমন যেন ধুকধুক করছিল, যেন সে জানে—এই বাড়ির সঙ্গে তার আগের কোনো যোগসূত্র আছে।

কিছুক্ষণ পর, ভেতর থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো।

হিজাব পরা সেই নারীকে দেখে রায়ান মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার মুখ থেকে একটাই কথা বের হলো,

— "চাচিমা, আপনি?"
চাচি হতভম্ব হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— "রায়ান! কতদিন পর দেখছি তোকে! কই ছিলি রে এতো দিন? হঠাৎ মীরপুরে!"

রায়ানের গলা ধরে এলো। সে ধীরে ধীরে বলল,

— "চাচিমা, আপনি জানেন না, আপনাদের খুঁজতে খুঁজতে কত জায়গায় ঘুরেছি। শেষমেশ আজ আপনাকে পেয়ে গেলাম!"

তার চোখে পানি এসে গেল। সে কাঁদতে চাইছিল না, কিন্তু একটা অজানা কষ্ট বুকের ভেতর থেকে চেপে ধরছিল।

চাচিমার চোখেও জল টলমল করছিল। তিনি একটা হাত বাড়িয়ে রায়ানের মাথায় রাখলেন,

— "পাগল ছেলে, তুই আমাদের খুঁজছিলি? আমরা তো ভেবেছিলাম, তুই..."

চাচিমার কথা মাঝপথে থেমে গেল। তার মুখে বিস্ময় আর ভয় মিশে ছিল।

কি হয়েছিল রায়ানের সঙ্গে?

কেন সে এতদিন চাচিকে খুঁজছিল?

চাচিমা মাঝপথে থেমে গেলেন কেন?

আজমল স্যার কোথায়?

রায়ানের অতীতের কোনো গোপন সত্য কি এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে?

রায়ান কি এবার সত্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে?

রায়ান ঘরে ঢুকে বসল। পুরোনো কাঠের চেয়ারের কিঞ্চিত কড়মড় শব্দ হলো। ঘরটা বেশ পুরোনো, দেয়ালের কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছে, জানালার পর্দা মলিন। যেন অনেক কিছুই সময়ের সাথে সাথে ম্লান হয়ে গেছে।

আশা বেগম এক কাপ চা এনে রায়ানের সামনে রাখলেন। তারপর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

— "হঠাৎ মীরপুরে?"

রায়ান চায়ের কাপে হাত রেখে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর শান্ত গলায় বলল,

— "দুইটা কাজে আসছি চাচিমা। প্রথমটা প্রাইমারি স্কুলের ডোনেশনের জন্য। আর দ্বিতীয়টা... আজমল স্যারকে খুঁজতে।"

আশা বেগম চমকে গেলেন। এক মুহূর্ত থমকে থেকে বললেন,

— "আজমলকে? হঠাৎ এত বছর পর ওকে খুঁজছিস কেন?"

...

আশা বেগমের মুখে শব্দ বের হলো না। তার চোখ ছলছল করতে লাগল। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল, যেন এক বোঝা তার কাঁধ থেকে নামল।

রায়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— "শুনে ছিলাম, আজমল স্যার নাকি ডোনেশন তুলতেন, কিন্তু চাচা তো অনেক আগেই মারা গেছে। আমি জানি, কিন্তু চাচা যে আজমল—এটা জানতে খুব দেরি হয়ে গেছে।"

আশা বেগমের মুখের রং সাদা হয়ে গেল। তার চোখে যেন ভেসে উঠল পুরনো স্মৃতি, যা অনেক দিন ধরে তার অন্তরালে ছিল।

রায়ান একে একে অনেক প্রশ্ন করে ফেলল, যেন পুরো ছবিটা পরিষ্কার করতে চাইছে। সে বলল,

— "চাচিমা, আরিয়ান তো—তার একটা বোন ছিলো, নাম জানি কি ছিলো... ও কি বাড়িতে নাই? আর আরিয়ান-এর বউ কোথায়? আরিয়ান মারা যাওয়ার পর কি চলে গেছে ও?"

আশা বেগম একটু থমকে গেলেন। তার চোখে যেন ভেসে উঠল অনেক পুরনো স্মৃতি, যা একসময় তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে ধীরে বললেন,

— "রাফা তো নার্সের কাজ করে ঢাকায়, তবে নদী... আরিয়ান মারা যাওয়ার পরেও, 'আমাকে ছেড়ে যায়নি, এখনো আমার সাথে আছে।' আজকে বাপের বাড়িতে গেছে" "অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে মেয়েটি আমার সাথে থাকে বাড়ি থেকে অনেকবার নিতে চেয়েছিল কিন্তু মেয়েটা আমার রেখে রাফাকে রেখে কোথাও গেল না সে আমার বউ না আবার একটা মেয়ে "
রায়ান একটি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো, মনে মনে ভাবছিল, "আমার ভুলের মাসুল ওরা দিয়েছে..." তার চোখে একধরনের দুঃখ আর তিক্ততা ছিল। সে বুঝতে পারছিল, অনেক কিছুই মিস করেছে, এবং সে যেভাবে ভাবছিল, সেটা সব সময় সঠিক ছিল না।

হঠাৎ, আশা বেগম বললেন,
— "বিয়ে করছিস না?"

রায়ান হালকা হেসে বলল,
— "না, চাচিমা..."

এরপর আশা বেগম আবার প্রশ্ন করলেন,
— "ওই যে মেয়ে, সাথে তুমি পরিচয় করাচ্ছিলি, সে কোথায়?"

রায়ান চুপ হয়ে গেল। মনে হল, সে কিছু বলতে চাচ্ছিল না, তবে আশা বেগম আবার বললেন,
— "মেয়েটা কত ভালো ছিল, রায়ান..."

রায়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
— "শুধু দেখানোর জন্য ভালো ছিলো, চাচিমা। তার তো অন্য কিছু চাওয়া ছিল—তার টাকা চায়!"

আশা বেগম একটু থমকে গেলেন। তার মুখে হতাশার ছাপ ছিল।

— "তুমি কেন এমন বলছ? মেয়েটা তো তোমার প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল ছিল।"

রায়ান অথচ একটু রুক্ষভাবে বলল,
— "সহানুভূতির কথা না বললেই ভালো, চাচিমা। বাস্তবে সবাই কিছু না কিছু চায়, বিশেষ করে যখন টাকার কথা আসে!"
আশা বেগম রায়ানের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
— "থাক, দেখবি তোর ঘরে একজন আসবে, সে তোকে তোর সবটা দিয়ে ভালোবাসবে।"

রায়ান ধীরে ধীরে বলল,
— "দোয়া কইরো, বড় হতে পারি, আর বিয়ে করতে চাই না..."

আশা বেগম হাসতে থাকলো রায়ান কিছু টাকা দিয়ে বললেন,
— "নেন, চাচিমা।"

আশা বেগম থামিয়ে দিয়ে বলল,
— "না, কি করছিস রায়ান? আমি আপনার ছেলে না, প্রথম ইনকাম দিতে পারলাম না, এখন চাইলে নিবেন না। আর আরিয়ান কি শুধু আপনার ছেলে? আমি তো আপনার কিছু না!"

আশা বেগম এটা শুনে হো হো করে কেঁদে উঠলেন। তার চোখে বেদনা আর ভালোবাসার মিশ্রণ ছিল। রায়ান তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— "আমিও আপনার একজন ছেলে, মা! আমারো তোমার ভালোবাসা চাই। নাও মা, তোমার ছেলে তোমাকেই দিছে!"

আশা বেগম আবেগে ভেসে গেলেন, তার চোখের জল থামছিল না।
— "তুই আমার ছেলে, রায়ান। তুই আমার সন্তান, আমার পেটে না হয়ছ তারপরেও তুই আমার সন্তান আমার খুব কাছের। আমি তোর জন্য সব সময় থাকব, তুই যেখানেই থাক, তোর জন্য দোয়া করব।"

রায়ানের চোখের কোনে, পানি এসে ভিড় করছে।

"একজন ছেলে হারানো মা আর একজন ভালোবাসার কাঙাল"—এটা একটা গভীর অনুভূতি ও দ্বন্দ্বের প্রতীক। একজন মা যখন তার সন্তানের হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা বহন করে, তখন তার হৃদয়ে এক ধরনের অদৃশ্য শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই শূন্যতা শুধু সময়ের সঙ্গে বাড়ে, কিন্তু কখনো পূর্ণ হয় না। তার আর্তনাদ যেন পৃথিবীজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, কিন্তু কেউ সেই আক্ষেপ বোঝে না।

অন্যদিকে, একজন ভালোবাসা কাঙাল তার জীবনে সেই ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত থাকে, যা তাকে পূর্ণ করতে পারে, যা তাকে দিকনির্দেশনা দিতে পারে। সে ভালোবাসার জন্য মরিয়া থাকে, প্রতিটি মুহূর্তে সেই ভালোবাসাকে খোঁজে।

এই দুই অবস্থার মাঝে এক ধরনের মেলবন্ধন হতে পারে, যেখানে একজন ভালোবাসার কাঙাল একজন মা-এর ভালোবাসার পূর্ণতা পায়। যখন তার জীবন শূন্য মনে হয়, তখন সেই মা হয়তো তাকে নতুন করে ভালোবাসার প্রেরণা দিতে পারে।

চলবে!!!
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url





sr7themes.eu.org
How To Get It For Free?

If you want to get this Premium Blogger Template for free, simply click on below links. All our resources are free for skill development, we don't sell anything. Thanks in advance for being with us.