অমিতের_বউ
#অমিতের_বউ
সুমি আক্তার
অফিসে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ চুন হয়ে গেল অমিতের। রিসেপশন থেকে নিজের ডেস্ক পর্যন্ত আসতে মনে হচ্ছিল জোড়া জোড়া চোখ ড্যবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণায় হাসির ঝিলিক বা হয়ত হাতের পাতায় মুখ ঢেকে হাসছে চুপিচুপি। তার মধ্যে ম্যানেজার অনির্বাণ দাশগুপ্ত আর তার অ্যাসিটেন্ট সৌমিলির যে কি প্রবলেম অমিতকে নিয়ে তা যদি অমিত একটু বুঝত। সেই যেদিন থেকে অফিসে ঢুকেছে সেই দিন থেকে খেপা কুকুরের মতন পিছনে পড়ে রয়েছে। চেক ইস্যু করতে দেরি করবে। কিছু বলতে গেলে বেঁকিয়ে তাকাবে! নয়ত ফ্যাস ফ্যাসে গলায় বিরক্তির কয়টি বাক্য ছুঁড়বে। সঙ্গে তাল দেবে সৌমিলি।বলবে, ওয়েট তো করতেই হবে। প্রত্যেকটা জিনিসেরই তো একটা প্রসিডিয়র আছে।এ তো আর আলাদিনের চিরাগ নয় যে ঘষলে সব সামনে হাজির হবে।ব্লা ব্লা আরও কত কি! আর আজকাল ওদের উল্লাস আরও বেড়েছে অমিতের জীবনের ঐ অদ্ভুত ঘটনার পর থেকে। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বুক বেয়ে। কেন যে অমিতের সঙ্গেই এমন হল! আর পাঁচটা ছেলের মতন যদি নরম্যাল ভাবেই সব হয়ে যেত তবে কি যেত উপরওয়ালার? সামনে দাঁড়িয়ে প্রদ্যুমন ঘোষ। চোখ চিক চিক করছে। ঠোঁটে চটুল হাসি। অমিতের মনে হচ্ছিল সারা শরীরে আগুন জ্বলে গেল। মনে হচ্ছিল চেয়ার ছেড়ে উঠে মাথার পিছনে জোর চাটি লাগায়। ঠ্যাস ঠ্যাস ঠ্যাস...
..."হেই! হোয়াট হ্যাপেনড? মন কেমন করছে? আরে চিল ম্যান। এক গেয়ি তো ক্যায়া দুসরি আ জায়েগি! "শরীর দুলিয়ে হাসছে প্রদ্যুমন।
সঙ্গে সঙ্গে পাশের ডেস্ক থেকে ছুটে এল শীতাংশু..."এখন মোবাইল স্ক্রিনে কার ছবি রাখছো বস! ''খিক খিক হাসছে শীতাংশু।
খট খট হিলের শব্দে দু পাশের ডেস্কের মাঝের লম্বা প্যাসেজ পেরিয়ে যাচ্ছিল সৌমিলি। অমিতের ডেস্কের জটোলার দিকে তাকিয়ে পায়ের গতি মন্থর করে আলগা ভাবে ছুড়ে দিয়ে গেল কানের ভিতর গরম সীসা ঢালার মতন একটা ইংরেজি শব্দ "লুজার"...
মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে অমিতের। চোয়াল শক্ত। নাকের পাটা ফুলে গেছে। এবার ফেটে পড়বে অমিত। এরকমই হয়ে গেছে চেহারাটা। বোমের সলতেতে আগুন লাগিয়ে দূরে ছুটে পালাবার মতনই এবার ছিটকে ছড়িয়ে গেল প্রদ্যুমন আর শীতাংশু। ওরা চলে যেতে মনে হল গরম ভাপ সরে গেল। মাথার ভিতর রাগটা এখনও চক্কর মারছে। আস্তে অমিত হাত রেখেছে মাউসে। কালকের কাজটা অর্ধ সমাপ্ত হয়ে সংরক্ষিত রয়েছে ফোল্ডারে। ক্লিক করল।মনটা এখনও স্থির হয়নি। পরশু সন্ধেয় অজয়দার বাড়ির ডাইনিং রুমে চলে গেছে। একটা বারও কি অমিত বুঝেছিল বন্ধু স্থানীয় অজয়দা। বয়সে পাঁচ ছ বছরের বড়ো। পরিচয় হয়েছিল আগের অফিসে। সে কি না ফোন করে বলল অমিত তোকে আজ আমাদের সঙ্গে ডিনার করতে হবে। শুনে খুশি হয়েছিল মনটা। যাক এই ভ্যাদভ্যাদে অস্বস্তি নিয়ে আর দিন কাটানো যাচ্ছে না এবার একটু ফিনফিনে বাতাসের ঝাপটা লাগলে যদি মেজাজটা ঘোরে। কিন্তু ঘুরে ফিরে ঐ এক। সঙ্গে করে অমিত নিয়ে গেল দু শ টাকার তাল শাস সন্দেশ। অজয়দার বউ এর জন্য হাত বটুয়া। মাসিমাই বা বঞ্চিত থাকেন কেন? সঙ্গে নিল সারদা মার ছবি। ছবি খানা হাতে নিয়ে প্রথমে অজয়দার বউ পারোমিতা বউদি কেমন যেন মুচকি হাসলেন। তারপর দিলেন অজয়দার মা'র হাতে। ওনার মুখে অবশ্য তেমন কোনো ভাবান্তর ছিল না। কপালে ঠেকিয়ে ছিলেন ছবিটা। কিন্তু খেতে বসে সবে যখন অমিত মটন কষায় লুচি ছিঁড়ে ডোবাল সঙ্গে সঙ্গে পারোমিতা বউদির প্রশ্ন..."আচ্ছা অ্যকচুয়াল কেসটা কি হয়েছিল? "
মুখে ততক্ষণে লুচি ঢুকে পরেছে।গ্রাস নালি বেয়ে নামছে। এমন আকস্মিক প্রশ্নের আক্রমণে স্নায়ুরা হকচকিয়ে যেতে এপিগ্লটিসের ঢাকনা খুলে লুচি মাংসর জুস ঢুকে পড়ল শ্বাস নালীতে। আর কে সামলায় তখন! বিষম খেয়ে কাশতে কাশতে সে কি অবস্থা। অজয়দা তালুত থাপড়াতে থাপড়াতে বউকে ধমকাচ্ছে..."আঃ এ সব প্রশ্ন খাবার টেবিলে কেউ করে? "
কিছুটা ধাতস্থ হয়ে যখন অমিত সবে স্বাভাবিক নিশ্বাস নিচ্ছে তখন মাসিমা করুণ মুখ করে বললেন..."কেমন দেখতে ছিল? খুব সুন্দর? "
পারোমিতা বউদিও ঝাঁপিয়ে পড়ল..."তোমার সঙ্গে এ নিয়ে আগে কখনও কথা হয়নি? "
আর অজয়দা যে নাকি বউকে একটু আগে ধমকাচ্ছিল সেও নেমে পড়ল ময়দানে..."তুই কিচ্ছু টের পেলি না? আজব ব্যাপার কিন্তু। তুই তো ফোনে কথা টথা বলতি? একবার দু বার তো বেরিয়েও ছিলি! "
হাত আর মুখে উঠছিল না। গম্ভীর ভাবেই বসেছিল অমিত সে দেখে অজয়দা বলল..."আরে থেমে রইলি কেন? নে নে শুরু কর! সব যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল! বুঝলি অমিত থামলে চলবে না। লাইফটাকে ঠাণ্ডা হতে দিসনি কখনও! "
ঠাণ্ডা নয় সে সময় মেজাজটা গরমই হয়েছিল অমিতের।
অফিস থেকে বেরতে আজ টিপ টিপ বৃষ্টি পিছু ধরেছিল। বাসেও অটোতে আধভেজা হয়েই ঘরে ঢুকেছে। ঘরে ঢুকেও তো ঐ এক দৃশ্য। ক্ষণে ক্ষণে মা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আর বাবা বলে মা মা গো... নিজের মরা মা মানে অমিতের ঠাকুমা স্নেহময়ী দেবীকে ডাকেন না দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণীকে ডাকেন তা নিয়ে অমিত প্রায়ই ভাবে!
ঘরে ঢুকে ওয়াড্রোব খুলে টি শার্ট আর ট্রাউজার বের করে যখন পাল্লাটা বন্ধ করল তখন একটা চঞ্চল করার মনত অনুভূতি সুড় সুড় করছিল মাথার পিছনের কাছটায়। অমিত তাকাল সারা ঘরে। নতুন রঙ হয়েছে। খাটটা বার্নিশ করেছে বাবা নিজে হাতে। লোকটা এ সব নিজে করতে ভালবাসে।এছাড়া আরও কত কি তো হল! দেওয়ালের রঙ পর্দার রঙ ম্যাচিং। বাথরুমের টাইলস শোকেস শাওয়ার সব নতুন। কেন? না অমিত নতুন ভাবে জীবন শুরু করবে বলে! কত স্বপ্নে সাজিয়েছিল এই ঘর। বাড়িটাকে। এতদিনে ঘরময় নতুন শাড়ির গন্ধের ঘোরপাক খাওয়ার কথা। অমিতের এই বুনো ঘরটার কোণায় কোণায় মেয়েলি পরশ লাগার কথা। কিন্তু তা হল না। বাগানের মাটি উর্বর করা হল কিন্তু তাতে গাছ আর বসল না। এখন কোথায় ফুল আর কোথায়ই বা প্রজাপতি?
কাল যেমন ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি তাড়া করে ছিল আজ তেমনি কটকটে রোদ।জলে ফুলে ওঠা কাঠ শুকিয়ে আগুন ধরে যাবে। বাসে তেমন ভিড়। ঠেলাঠেলি গুতো গুতি। লেদারের চৌক অফিস ব্যাগটা বার বার কাঁধে তুলছিল অমিত। লম্বায় অনেকটাই। তার একটা অ্যডভানটেজও আছে। চওড়া হওয়ার সুযোগে ভিড়ের মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়া যেমন যায় তেমন চাপটাও তো নিতে হয়। এই যেমন এখন পেটের কাছে শিং মারার মতন গুতো মারছে একটা গাট্টা গোট্টা বেঁটে লোকের মাথাটা। পিছনে কেউ শক্ত কিছু দিয়ে ঠেলা মারছে। এরই মধ্যে হঠাৎ এক রমণী কন্ঠে গালাগালির ফোয়ারা... কাকে ধুচ্ছে কে জানে! বাপ মা ভিটে মাটির নাম ভুলিয়ে রেখে দিচ্ছে। তবে গলাটা যেন চেনা...
..."শুয়রের বাচ্চা.. ব্লাডি স্কাউন্ড্রেল.. মা এসব শেখায়? দেশের কলঙ্ক ব্লাডি বজ্জাত... "
..."কি হল দিদি? "কেউ একজন বলল।
সে চেঁচাল..."এই লোকটা আমার সঙ্গে মিসবিহেভ করে যাচ্ছে তখন থেকে! "
..."কি করেছে? "জিজ্ঞেস করল একটা বয়স্ক গলা।
এবার খেপে গেল সে..."কি করেছে তার ডেসক্রিপশন দিয়ে ওনাকে দরখাস্ত দিতে হবে মনে হচ্ছে! "
ভারি গলা উঠে এল..."এটা ঠিক করছেন না আপনি বাসে ভিড়ে গায়ে গা ঠেকে যেতেই পারে। তার মানে এই নয় যে আপনি বাপ মা তুলে গাল দেবেন। মেয়েছেলে বলে চুপ করে আছি নইলে হাত আমারও উঠতে পারে! "
..."কি কি বললি? গায়ে হাত তুলবি? নোংরামি করে গলা বাজি?"
..."মুখ সামলান আপনি।আপনি কিন্তু বেশী সাহস দেখাচ্ছেন!"
..."সাহস আমি দেখাচ্ছি না তুই? "মেয়েটা গরজে উঠল।
অমিত ভিড় ঠেলে ঠুলে হট্টগোলের কাছে চলে এসেছে। মেয়েটাকে পিছন থেকে দেখছিল। একটা পনি টেল লফাচ্ছিল ডায়ে বাঁয়ে।পনি টেল টুক করে এ পাশে মুখ ফেরাতেই চিনে ফেলল।কলেজের সোমলতা। বরাবর ডেসপারেট। মুখ আলগা। স্থান কাল না দেখেই হুট হাট কথা বলে ফেলত। সেই জন্য খুব একটা সোমলতাকে ভাল লাগত না অমিতের। মনে হত মেয়েদের একটু চুপচাপ শান্ত প্রকৃতির হওয়াই ভাল। আর মেয়েদের মুখে গালাগাল? যেন বারে গঙ্গা জল বিক্রি। দেখতে ভালই ছিল। নরম তরম মুখ। রংটা চাপার দিকে। চোখ মুখে চঞ্চলতা। কলেজে যে সোমলতার ওর প্রতি একটু দুর্বলতা ছিল তাও টের পেত অমিত। কোনো দিনই আমল দেয়নি মেয়েটাকে সেরকম ভাবে।
এবার সামনের চওড়া ছাতির ভুঁড়িওয়ালা লোকটা গলা চড়িয়ে বলল..."উহু সতি সাবিত্রী হয়ে বাসে উঠেছে। ছোঁয়া লাগলে যেন ভস্ম করে দেবে। অতই যদি খুঁত খুঁত তবে ভিড় বাসে ওঠা কেন? একা ট্যাক্সি ধরে যাবেন! "
কেন যেন অমিতের হাতটা নিসপিস করে উঠল। অন্যায়ের উপর অন্যায়। এরকমই কি লাগাতার হচ্ছে না ওর সঙ্গেও। কেউ একটা কাণ্ড ঘটাল তার পুরো প্রভাবটা ঠেলতে হচ্ছে এখন এই অমিতকেই। এত দিনের রাগ বিদ্বেষ আক্রোশ গুলো জরো হচ্ছিল অমিতের আঙুলে। মুঠিতে শক্তি জমছিল। একেবারে নিজের অজান্তেই জোর চাপট মারল লোকটার মাথার পিছনে।লোকটা হকচকিয়ে তাকিয়েছে। বাস থেমে গেছে ততক্ষণে। যে যার মতন নেমে পড়ছে গায়ে ধাক্কা ধাক্কি দিয়ে। অমিত তুড়ি মেরে বলল..."খুব সাবধান।মেয়েদের সম্মান দিতে না পারলে সমাজ কিন্তু সবার সামনে সম্মান খুলে নেবে। ঠিকাছে? কোন সাহসে একজন মহিলার সঙ্গে এত উঁচু গলায় কথা বলছেন? আর উনি পাগল নন যে অহেতুক আপনার উপর দোষ দেবেন! "
অমিতের চোখ মুখে এমন কিছু একটা ছিল যে ভয় পেয়ে গেল লোকটা। মাথার পিছনে হাত বোলাতে বোলাতে নেমে গেল। কণ্ডাক্টার বাসের গায়ে থাপড়াচ্ছে। বাস থেকে নেমে পড়েছে অতিম আর সোমলতা দু জনেই।
সোমলতা বাচ্চা মেয়ের মতন একটু থির থির করে লাফিয়ে দু হাতে জড়িয়ে ধরল অমিতের গলা..."লাভ য়ু লাভ য়ু লাভ য়ু.. ওহ অমিত হোয়াট আ হিরোইজম ম্যান।"এদিক ওদিক তাকিয়ে সোমলতা বলল..."একটা মালা থাকলে এখুনি তোর গলায় পরিয়ে দিতাম! এই তোর বিয়ে হয়ে যায় নি তো? "চোখ পিটপিট করছে সোমলতা।
ওর ছেলেমানুষী দেখে হেসে ফেলল অমিত। বুকটা হালকা লাগছে। ধোঁকাবাজির মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মারছিল নিষ্পাপ ছেলেমানুষী। খোলা মনের মানুষই তো ভাল। ওর মুখে যা তাই মনে। সোমলতা কোনো রহস্য মনের সিন্দুকে তালা বন্ধ করে রাখে না। অমিত বলল..."না বিয়ে হয়নি। "
..."বাহ। গুড গুড। কিন্তু এখন করছিস কি বল? "
..."বেসরকারী ফার্মে কলুর বলদের মতন খেটে পেট চালাচ্ছি! আর তোর খবর বল? "
..."নাথিং স্পেশ্যাল ইয়ার। ছোটো খাটো জব ছাড়ছি করছি এই... এখন একটা ফার্মের ব্যক অফিস ম্যানেজমেন্টে আছি! "
..."হুম! "অমিত কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে।
..."একদিন চল না কোথাও বসি। যদি ফ্রি থাকিস আর কি! "সোমলতা বলে যেন লজ্জা পেল।
..."এই সানডে? "
..."ডান! "জ্বলজ্বলে চোখে বলল সোমলতা।
মনটা আজ এক দমকা হাওয়ায় ভাল হয়ে গেল। যেন অনেক দিনের গুমোটের পর মুষলধারার বৃষ্টি। আজ অফিসে ঢুকে কোনো রকম হীনমন্যতা বোধ হল না। হাঁটা চলায় আত্ম বিশ্বাস। কাউকে পরোয়া না করার অ্যটিটিউড চলে এল শরীরের প্রতি পেশীতে।ডেস্কে বসে গম্ভীর ভাবে তাকাল পাশের ডেস্কের শীতাংশুর দিকে। শীতাংশু রসালো হাসি হাসতে চাইছিল কিন্তু তেমন সুবিধা করতে পারল না। অমিতের দু চোখে আজ আত্মবিশ্বাসের প্লাবন।
রাতে বিছানায় শুয়ে অমিত অনুভব করছিল ওর এতদিনের অভাবটা পুরণ করার মানুষটা কে? হয়ত সোমলতাই। আর সোমলতা আসবে বলেই যেটা হওয়ার ছিল না সেটা হল না। এই প্রথম সোমলতা অন্য রকম ভাবে মনের ভিতর প্রবেশ করল।
এরপর চলল দেখা সাক্ষাতের পালা।বেশীর ভাগ সময়ই অফিস ফেরার সময়। সোমলতার অফিসের সামনেই অপেক্ষা করে অমিতও বেরিয়ে এলে ওর মুখটা দেখতে পেলে মনে হয় মেঘ সরে সূর্য উঠল ঝলমলিয়ে। সোমলতা হাসে শিশুর মতন..."সরি সরি! কতক্ষণ ওয়েট করছিলি? "
একটু রোম্যান্টিক কায়দায় অমিত বলে..."তুমহারে ইনতিজার মে এক জনম ভি কম হ্যায় জানেমন! "
..."ওরে বাবা। তোর এমন বদল হল কি করে অমিত? "
..."বয়স বাড়ার সঙ্গে! "
..."বাহ। তবে বয়স আরও বাড়লে মনে হয় আরও ভাল ভাল পরিবর্তন হবে! "
..."যা হবে সব তোর ফেবারেই হবে! "
..."যেমন? "
..."যেমন? যেমন কেমন? "
দু জনে হাঁটছিল ফুটপাত ধরে। রাস্তা জুড়ে স্ট্রিট লাইটের ছড়াছড়ি। বৃষ্টি পড়েছে, একটু আগে তাই পথময় ভেজা ভেজা ভাব। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সোমলতা পাশে হাঁটতে থাকা অমিতের দিকে তাকিয়ে বলল..."তুই জানতিস তুই আমার কলেজের ক্রাশ ছিলি? "
শুনে বুকটা ধক করে উঠল অমিতের। অমিত জানত। অমিত জানত সোমলতা ওর প্রতি উইক। অমিত তখন জেনে শুনে এড়িয়ে গেছে। সেই অমিতই এখন পাগলের মতন ঘুর ঘুর করছে সোমলতার জন্য। কারণটা অমিতের কাছে জানা কিন্তু সোমলতার নয়। অথচ কি সাহস মেয়েটার। অকপটে স্বীকার করল ও ওর ক্রাশ ছিল। অমিতকে এমন থতমত খেতে দেখে সোমলতা মুখে চাপা দিয়ে হাসল..."এমন ভয় পেলি যেন কি বিরাট অন্যয় করে ফেলেছিস! আরে আমি তো কখনও তোকে বলিনি সে কথা। বাই দ্যা ওয়ে তুই স্ট্রেস নিস না আমরা এক সঙ্গে সময় স্পেন্ড করছি মানে এই নয় যে তুই আমার ক্রাশ ছিলি বলে তোকে আমায় বিয়ে করতে হবে। অ্যাণ্ড মাইণ্ড ইট ক্রাশ ছিল ওকে? পাস্ট! "
সোমলতা হাঁটা দিল।
অমিত ওর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল..."পাস্ট? তারমানে এখন তুই ফিল করিস না আমার জন্য? "
চোখ ঘুরিয়ে সোমলতা বলল..."আ করি বাট..
..."বাট হোয়াট সোমলতা? তোর কি মনে হয় অফিসের অত পরিশ্রমের পরও আমি তোর জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করি শুধুই টাইম স্পেন্ড করার জন্য? আর কোনো কারণ নেই? "
সোমলতার দু কাঁধে আলত হাত রাখল অমিত..."আমি জানি না আমার কি হচ্ছে সোমলতা বাট আমি চোখ বুজলে শুধু তোকে দেখি।আই থিংক আই ফল ইন লাভ উইথ য়ু! "
চোখের পলক ফেলতে দুটো বড়ো বড়ো ফোঁটা পরল সোমলতার চোখ দিয়ে। অমিতের ঠোঁট ধীরে ধীরে নেমে আসছিল সোমলতার ঠোঁটের কাছে একটা লাক্সারি বাসের বিশ্রী হর্নে চমকে উঠল দু জনেই। দুজনে স্থির। স্তব্ধ। সোমলতার হাতটা আস্তে ধরে অমিত বলল..."আমি একটা বাজে এক্সপেরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে গেছি সোমলতা। তুই শুনবি? "অমিত তাকাল সোমলতার দিকে।
ভুরু জরো হয়েছে সোমলতার..."কি রকম? "
প্রায় পাঁচ মাস আগের অতীতে ফিরে গেল অমিত। বাড়ি ঘর রং হচ্ছে। মা মোবাইলে গল্প করে চলেছেন কি কি কেনা হবে কি কি করা হবে এসবের। কাজের মাসিকে বললেন..."তপুর মা তোমার একটা ভাল শাড়ি পাওনা রইল। অমিত দাদাবাবুর বিয়ে গো! "
বিয়ে ঠিক হয়েছিল বাবার অফিসের কলিগ মারফত। মেয়ে সুশ্রী। শিক্ষিতা। অমিত সপরিবারে দেখেও এল। দেখে আসার পর থেকেই স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করল অমিত। সারা ঘরময় এবার ছড়িয়ে যাবে মেয়েলি সুবাস। কেউ ভোর বেলা চুড়ির ঠুং ঠাং শব্দে ঘুম ভাঙাবে। তার নরম ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে শুরু হবে সকাল। কেউ পথ চেয়ে বসে থাকবে অমিতের বাড়ি আসার। অমিতকে ভালবাসার অমিতের জীবনে জাঁকিয়ে বসার সেই মেয়েটি আসছে। যাকে পিউবার্টির পর থেকে আবছা আবছা দেখে। মেয়েটির নাম ছিল অয়ন্তিকা। ফোনে কত কথা হয়েছে। তবে, একটা ব্যাপার যেটা তখন অমিতের তোমন সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি তবে এখন মনে হচ্ছে তা হল অয়ন্তিকা নিজে থেকে তেমন কথা বলত না। যতটুকু জিজ্ঞেস করত অমিত তার উত্তর দিত। অমিতের তো শান্ত চুপচাপ লাজুক মেয়েই পছন্দ ছিল তাই এই নিয়ে মাথা ঘামাইনি বরং ভেবেছে যে যেমন চায় ভগবান তাকে ঠিক তার মতনই জুটিয়ে দেয়। বার কয়েক বেরিয়েওছে এক সঙ্গে। অয়ন্তিকা মেপে ঝেপে কথা বলেছে। পরিমিত হেসেছে। অমিতের মনে হয়েছে মেয়েটা ইনট্রোভার্ট। তারপর বিয়ের দিন এল গুটি গুটি পায়ে। মাথায় টোপর চড়িয়ে অমিত চলল বিয়ে করতে। সে কি আড়ম্বর। গাড়ি ফুলে ঢাকা। অমিতের গায়ে দামি তসরের পাঞ্জাবি। সিল্কের ধুতি। সোনার ঘড়ি। গায়ে সুবাস। গলায় মোটা মালা।বিয়ে বাড়িতে গিয়ে বরণও হল সাড়ম্বরে।কিন্তু তারপর? লগ্ন পেরিয়ে যায় বাড়ির সকলে উসখুক করে কিন্তু কোনে পক্ষ চুপ। শেষে বিরক্ত হয়ে অমিতের মামা গিয়ে ধরে কন্যা পক্ষ কে। তখন জানতে পায় বিউটিপারলারে সাজতে গিয়ে মেয়ে তার পুরনো বয়ফ্রেণ্ডের বাইকে চেপে হাওয়া!
এত অবধি শুনে এত্ত বড় হাঁ করে মুখে হাত দিয়ে চাপা দিল সোমলতা..."এ বাবা। এতো সিনেমার মতন! "
দুজনে এখন মুখোমুখি রেস্তরাঁর চেয়ারে বসে। কফি কাপ হাতে তুলে অমিত বলল..."বাট এটা সিনেমা নয় আমার লাইফ। ভাব তখন আমার কি অবস্থা! এদিকে বাবা আর মামা পুলিশ কোর্ট এসবের ধমকি দিয়ে তাণ্ডব শুরু করেছে। মেয়ের পক্ষও সরব। চিল্লা মিল্লি বিতীকিচ্ছিরী ব্যাপার। কিন্তু করারই বা কি ছিল? মেয়ে সাবালিকা। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তাই সে পালিয়েছে এতে তো কিছু করার নেই। তাই শূন্য গাড়ি নিয়ে সেই রাতেই বাড়ি ফিরে আসতে হল। সেই থেকে শুরু হল গুঞ্জন। পাড়ার লোকের উঁকি ঝুঁকি। বন্ধু বান্ধবের আহা উহু। অফিসে টোন্ট। আর মনে বিষাদের ভার।
সোমলতা আলত ভাবে হাত রাখল অমিতের হাতে..."আমি বুঝতে পারছি তোর উপর দিয়ে কি বয়ে গেছে! "
..."আমার শুধু একটা জিনিসিই খারাপ লেগেছে। আচ্ছা অয়ন্তিকা যদি আমার সঙ্গে অমন অ্যক্টিং না করে একবার বলত তাতে কি হত বল? ও একবারও আমার প্রেস্টিজটার কথা ভাবল না? "
..."ও হয়ত ভয় পেয়েছে। ওর বাড়ির লোক যদি ভালই হত তবে তোর সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করল কেন? আর তুই জানলে যদি ওর বাড়িতে বলে দিতিস তবে কি ওর প্ল্যান সাকসেস হত? "
মাথা নাড়ল অমিত..."রাইট ইউ আর! "
..."নিজের গায়ে ঝড় ঝাপটা নিয়ে মনে কর দু জন ভালবাসার মানুষকে মিলিয়ে দিয়েছিস। সো বি হ্যাপি ম্যান! ভাল কাজ হয়েছে তোর থ্রুতে! "
..."আর আমরা? আমাদের পাকাপাকি মিলটা কি করে হবে? "
ছোট্ট করে হেসেই যেন গম্ভীর হয়ে গেল সোমলতা। বলল..."অয়ন্তিকার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল তুই তো আমাকে ভুলেই যেতিস অমিত। হয়ত এই রেস্তরাঁয় আমাদের দেখা হত। তুই তোর বউকে আমাকে দেখিয়ে বলতিস এই মেয়েটার ক্রাশ ছিলাম আমি। তুই ভাও খেতিস। তোর বউ আমাকে নিয়ে হাসত। এরকমই কি একটা সিন হত না বল? "
মাথা নামিয়ে নিল অমিত।
সোমলতা বলল..."তুই তোর পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমার হাত ধরতে চাস তাই না? "
সোমলতার চোখের কোণে জল জমছিল। ওর হাতটা খপ করে ধরল অমিত..."শুধুই যদি পাস্ট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য হত তবে তোর কাছে সব খুলে বললাম কেন? এসব চেপে যেতে কি পারতাম না? তারপর বিয়ে হলে নয় জানতিস কোনো রকম ভাবে তখন তো আর কিছু করার থাকত না। কিন্তু আমি বলেছি। বলেছি কারণ তোকে ভালবেসে ফেলেছি বলে। ভালবাসি বলে সব শেয়ার করলাম সোমলতা আমার আর কোনো স্বার্থ নেই। তুই. তুই চাইলে আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারিস কিন্তু বিশ্বাস কর আমি তোকে ছাড়া কিচ্ছু ভাবতে পারছি না। আই রিয়েলি লাভ ইউ! "
চোখের কোণ মুছে ফিক করে হেসে ফেলল সোমলতা।ঠিক যেন ঝির ঝির বৃষ্টির পরে রোদ। নাক টেনে বলল..."ব্যস ব্যস আমাকে অত কনভেন্স করতে হবে না। আই ক্যন রিড ইউর ফেস। বাট একটা কথা কি খেয়াল করেছিস? "
..."কি? "অমিত ভুরু নাচাল।
..."তুই কিন্তু লগ্নভ্রষ্ট! "
বলেই হাসিতে লুটিয়ে পড়ল সোমলতা। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করেও গম্ভীর থাকতে পারল না অমিত। সোমলতার হাসিতে ডুব দিল নিজেও।
ঠিক তার দেড় মাসের মাথায় সানাই বাজল বাড়ির ছাতে। অমিতের নতুন রঙ করা ঘরে এখন মেয়েলি সুবাস ছড়িয়ে। বিছানায় শুয়ে মোবাইলে সোমলতার নাম্বারটা এডিট করছিল। সোমলতা মুছে লিখল মা'ই ওয়াইফি। নরম দুটো হাত সেই সময় জড়িয়ে ধরল অমিতের গলা। সুখ সুখ ভাব ছড়িয়ে পড়ছিল শরীরময়। সেই সময় ফোন করল অজয়দা। কানে মোবাইল চেপে অমিত বলল..."অ্যকচুয়ালি কেসটা হল কি অজয়দা। পারোমিতা বউদিকে বলো আমি আমার কলেজ প্রেমকে পেয়ে এখন ভীষণ হ্যাপি অ্যাণ্ড বিজি। তাই বোধহয় আর নেমন্তন্নটা খেতে যেতে পারব না! "
এদিকে খিলখিলিয়ে হাসছে সোমলতা। মোবাইল বন্ধ এখন। অমিত মিশে যাচ্ছিল সোমলতায়। একবার শুধু মনে পড়ল প্রদ্যুমন সৌমিলি আর শীতাংশুদের মুখ গুলো। এসেছিল রিসেপশনে। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যেন পেটের অ্যাসিড বুকে উঠে এসেছে। ওদের 'লুজার' না বললেও মনে মনে অমিত বলেছে বেচারা...
তবে এখন আর ঐ সব পচা মুখ নয় এখন অমিতের মন মস্তিষ্কে ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে একাজনই।সে হল অমিতের বউ সোমলতা!
সুমি আক্তার
#রিমা_বিশ্বাসের_কলমে
(লাইক কমেন্ট শেয়ার করার অনুরোধ রইল)
