তুমি_আছো_এ_মনে
তুমি_আছো_এ_মনে
পর্ব : ১
✍️ লেখিকা : সুমি আক্তার
নিজের চোখের সামনে স্বামীকে তারই প্রাক্তন প্রেমিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা যেন জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল প্রনার। তবুও সে কিছু বলেনি—শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আকাশ আর লিমার দিকে।
অন্যদিকে আকাশ নিজের হারানো ভালোবাসার মানুষকে ফিরে পেয়ে এতটাই আবেগে ভেসে গিয়েছিল যে সে ভুলেই গিয়েছিল তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার বিবাহিত স্ত্রী প্রনা।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর হঠাৎ প্রনা ধীর কণ্ঠে বললো—
প্রনা: “আপনি খুশি তো, মিস্টার চৌধুরী?”
আকাশের চিন্তার ঘোর যেন ভেঙে গেলো প্রনার কথায়। এবার সে দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো প্রনার দিকে। প্রনা তখন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আকাশের চোখের ভেতরে। আবারও ঠান্ডা কণ্ঠে প্রনা বললো—
প্রনা: “আমি-ই বা এসব কি বলছি! নিজের ভালোবাসার মানুষকে ফিরে পেয়ে কেউ খুশি না হয়ে পারে নাকি?”
প্রনার কণ্ঠে কষ্ট ঢেকে রাখা হলেও ব্যথাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আকাশ কোনো উত্তর দিলো না—শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
কিছুক্ষণ পর প্রনা শান্ত স্বরে বললো—
প্রনা: “আচ্ছা, আমি এবার আসি।”
কথা বলেই পার্স হাতে নিয়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো সে। হঠাৎ পিছন থেকে আকাশের কণ্ঠ ভেসে এলো—
আকাশ: “তুমি কি এখনই চলে যাবে, প্রনা? আর কিছুক্ষণ থেকে গেলে হয় না?”
প্রনার পা থেমে গেলো। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকালো সে। আকাশের চোখে প্রথমবারের মতো অদ্ভুত এক কোমলতা খুঁজে পেলো প্রনা। কিছুক্ষণ নিরব তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে একরাশ মিথ্যে হাসি এনে বললো—
প্রনা: “না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। এমনিতেই আমার জন্য আপনাদের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আমি চাই না, আমার কারণে আপনাদের সময় আর নষ্ট হোক।”
এবার সে তাকালো লিমার দিকে। চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বললো—
প্রনা: “আসি আপু। আপনারা দু’জন খুব ভালো থাকবেন।”
লিমা কিছুই বললো না। শুধু চোখের ভেতর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো প্রনার দিকে। এক মুহূর্তও আর দাঁড়াল না প্রনা—পার্স হাতে নিয়ে এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে গেলো কফিশপ থেকে।
কফিশপ থেকে বের হয়ে ধুলোমাখা পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে গেলো ঠিক এক বছর আগের কথা। সেদিনই হয়েছিল তার আর আকাশের বিয়ে।
প্রনার মা ও আকাশের মা ছিল ছোটবেলার বান্ধবী। তাদের স্বপ্ন ছিল একদিন আকাশ আর প্রনার বিয়ে হবে। কিন্তু প্রনার দশ বছর বয়সেই তার মা মারা যান। তারপর থেকে আর তেমন যোগাযোগ ছিল না দুই পরিবারের মধ্যে। তবুও আকাশের মা সেই শৈশবের প্রতিশ্রুতি ভোলেননি। আর তাই বড় হওয়ার পর জোর করেই প্রনার সাথে আকাশের বিয়ে ঠিক করলেন।
কিন্তু আকাশ চেয়েছিল লিমাকে। তবুও মায়ের জোরাজুরিতে প্রনাকে বিয়ে করেছিল। অথচ বিয়ের রাতেই আকাশ তাকে জানিয়ে দেয়—সে অন্য কাউকে ভালোবাসে, আর কখনোই প্রনাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে না।
প্রনা ভেবেছিল সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এক বছর কেটে গেলেও আকাশের হৃদয়ে জায়গা হলো না তার। অবশেষে প্রনা নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়—আকাশকে তার ভালোবাসার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেবে। আর তাই সে নিজেই খুঁজে বের করে লিমাকে, মিল করিয়ে দেয় আকাশের সাথে।
এমন সব ভাবনার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মাথা চক্কর দিলো প্রনার। পা থেমে গেলো, চোখে নামলো আধার। মুহূর্তেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো সে রাস্তার ওপর।
