তন্ত্র_যুদ্ধে_রক্ত_বাসর
#পর্ব_৪
#তন্ত্র_যুদ্ধে_রক্ত_বাসর
আমি জানালার পাশে দাঁড়ানো ডালিকে— না, মঞ্জুরাকে— একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখি।
ভেতরে ভীষণ কাঁপুনি উঠছে, কিন্তু এই মুহূর্তে ভয় নয়…
একটা অনুভূতি তীব্র হয়ে উঠছে —
ডালিকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই ওর দিকে।
সে চোখে চোখ রাখে না, জানালার বাইরে তাকিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে— যেন এই ঘরের বাতাস গিলে নিচ্ছে প্রতিদিন।
“তুই জানিস আমি কী হারিয়েছি?”
ওর ঠোঁটে সেই কাঁপা স্বর… কিন্তু কণ্ঠে হাহাকার, রাগ নয়—
অসীম শূন্যতা।
— “আমি প্রেম চেয়েছিলাম।
তোর বাবার কাছে, তোর রক্তের কাছে।
সে আমায় লোভে ঠকিয়েছে, দায় এড়িয়ে পালিয়েছে।”
আমি কাঁপা গলায় বলি—
— “তুই চাইলে আমি তোর জন্য কিছু করব, কিন্তু ডালিকে ছেড়ে দে। ওর দোষ নেই… ও কিছু জানে না।”
সে মুখ ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকায়।
চোখে তখন শুধুই ঘৃণা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ছায়া।
“তুই পারবি?
তুই পারবি নিজের বাবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রায়শ্চিত্ত করতে?”
আমি বলি, “হ্যাঁ! যদি তাতে ডালি বাঁচে, আমি করব।”
সেই মুহূর্তে ঘরের দেয়ালে নিজে নিজে আগুনের রেখায় ফুটে ওঠে এক মন্ত্র:
📿
“রক্তের বিনিময়ে প্রেম, প্রেমের বিনিময়ে ক্ষমা।
একটাই উপায়— তন্ত্র, প্রতীক আর সত্য স্বীকার।
নিজের রক্তের পাপ স্বীকার কর, নয়তো আত্মা ছিন্ন করবে সব।”
ঘর হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
ডালির চোখ থেকে জল পড়ছে, কিন্তু মুখ নিস্পন্দ —
মনে হচ্ছে ভিতর থেকে কেউ তাকে জোর করে ধরে রেখেছে।
📿 আমি দৌড়ে আবার পিসিমার ঘরে যাই।
— “পিসিমা, তন্ত্রে কীভাবে আত্মা শান্ত হয়? কিছু একটা করতে হবে!”
পিসিমা থমথমে গলায় বলে ওঠে—
“পুরনো বাক্সটা… যে বাক্সে ওর শেষ চিঠিগুলো ছিল, তার নিচে একটা তালা দেওয়া খাতা আছে।
সেটাতে ওর লেখা মন্ত্র, প্রতিশোধের শপথ, আর একটা অর্ধেক কাটা ছবি—
যেখানে ও আর তোর বাবা একসাথে।
ওকে শান্ত করতে গেলে ওই ছবিটা পুড়াতে হবে—
আর তোর নিজের রক্ত দিয়ে ওর শপথ ভাঙতে হবে।”
আমি ফিরে যাই সেই ঘরে, সেই বাক্সের কাছে।
পাতার নিচে পাওয়া গেল সেই তালা দেওয়া খাতা।
ভাঙা চাবি পিসিমা দিয়েছিলেন আগেই।
খুলতেই পুরনো হলুদ কাগজে একটা মন্ত্র চোখে পড়ে—
“যে প্রতিশ্রুতি ভাঙা হয়েছিল, তার উত্তরাধিকারী রক্ত দিয়ে তা পূর্ণ করুক।”
আমি কাটে আঙুল।
রক্ত টপকে পড়ে খাতার পাতায়।
দেয়ালে আগুনের দাগগুলো হঠাৎ হিমশীতল হয়ে পড়ে।
ডালির শরীর কাঁপছে।
সে একবার আমার দিকে তাকায়, চোখে এখন ডালির ছায়া।
কিন্তু তার মুখে তখনও সেই কণ্ঠ:
“তুই চাইলে আমায় মুক্তি দিতে পারিস।
আমার প্রেম কেউ বুঝেনি।
আমাকে কেউ বাঁচায়নি।
তুই যদি সত্যি চাস… আমার রক্তের গল্প শেষ কর।”
আমি ফ্রেম থেকে ছবিটা বার করি,
যেখানে বাবা আর মঞ্জুরা দাঁড়িয়ে, প্রেমিক যুগলের মতো।
সেই ছবিটা আমি ধূপ জ্বেলে পোড়াতে থাকি।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
ডালির মুখ থেকে এক চিৎকার বেরোয়—
তা কাঁপিয়ে তোলে পুরো ঘর।
🔥 হঠাৎ তার শরীর থেকে ধোঁয়ার মতো কিছুর উদ্ভব হয়—
রক্তের মতো লাল, বাতাসে ছড়িয়ে যায়।
সে চোখ বন্ধ করে কাঁপতে থাকে। আমি ডালিকে জড়িয়ে ধরি।
এক মুহূর্ত পর…
সাবধানে আমি ওর চোখে তাকাই।
— “ডালি?”
সে নিঃশ্বাস ফেলে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে বলে—
“আমার খুব ভয় করছিল… কেউ যেন আমার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল।”
আমি কেঁদে ফেলি।
ঘরের সমস্ত দাগ মুছে গেছে।
আয়নায় আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
চিঠির বাক্স, খাতা, সেই অর্ধেক ছবি—
সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
পিছন থেকে পিসিমার গলা আসে:
“তুই করেছিস… ওর মুক্তি।
এখন এই ঘর আবার ঘর হবে।
প্রেম হোক অভিশাপ নয়।”
শেষ দৃশ্যে...
ডালি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
আমি পেছনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি।
আয়নায় এক ঝলকে, এক মুহূর্তের জন্য...
মঞ্জুরার সেই চোখ আবার দেখা দেয়।
কিন্তু এবার হাসি নেই, ঘৃণাও নয়— শুধু একফোঁটা জল।
চলবে…
পর্ব ৫: “শেষ প্রতিশোধ, অথবা নতুন অভিশাপ”
আবার কি খুলবে অতীতের দরজা? নাকি শেষ হবে সব রক্তের ঋণ?
