রাত্রীপ্রিয়া
রাত্রীপ্রিয়া
সূচনা পর্ব
লেখনিতে: সুমাইয়া আখতার
গভীর রাতে হঠাৎ ঠোঁটে কারো শীতল ছোঁয়া টের পেতেই ঘুমের মাঝে কেঁপে উঠলো রাত্রী। ঘুমটুকু যেন হালকা হয়ে এল। এর মধ্যেই একজোড়া হাত ধীরে ধীরে কপালে কপাল ছুঁইয়ে ওষ্ঠে মিশিয়ে দিল গভীর এক চুমু। এক মোহময় কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলা হলো—
"তোমায় না দেখলে মন পুড়ে যায়, হৃদয় কেঁদে উঠে! প্রতিদিন দেখি, তবুও মনে হয় বহুদিন দেখি না। ওগো মনমোহিনী, তুমি আমার স্বপ্নলোকের রানী, আর আমি? তোমার স্নেহ ছোঁয়ার তৃষ্ণায় পাগলপ্রায় এক যুবক!"
কান ছুঁয়ে যাওয়া সে কণ্ঠস্বরেই যেন নিদ্রা ভেঙে বাস্তবে ফিরে এলো সপ্তদশী রাত্রীপ্রিয়া। ভয় পেয়ে উঠে বসতে চাইলেই, হঠাৎ এক পুরুষের শক্ত বাহু তাকে জড়িয়ে ধরে ফেললো।
চমকে উঠলো সে! চিৎকার করার চেষ্টায় ব্যর্থ হলো, কারণ ততক্ষণে ওই যুবক তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরেছে। পরিচিত গন্ধ, সেই অতি চেনা ছোঁয়ায় একটু স্থির হলো রাত্রী। ধীরে ধীরে শুনতে পেলো, আশ্বাস দেওয়া সেই কণ্ঠস্বর—
"ভয় পেও না, জান। আমি... তোমার নেতা সাহেব! চিৎকার কোরো না, কেউ শুনে ফেলবে। শুধু একটু চুপ করে থাকো, তোমার মাঝে মিশে যেতে দাও আমাকে..."
তারপর শক্ত করে আরও জড়িয়ে ধরলো নেতা সানাম চৌধুরী।
চোখ মেলে তাকিয়ে ড্রিমলাইটের আলোয় পরিচিত মুখটা দেখে একরাশ স্বস্তি পেলো রাত্রী। বিস্মিত কণ্ঠে বললো—
"সানাম ভাই! আপনি? আপনি আজ তো আসার কথা বলেননি!"
"কী সুন্দরী, কাউকে অপেক্ষা করছিলে নাকি?"
"উঁহু! একদম বাজে কথা বলবেন না, সানাম ভাই!"
"তাহলে বোঝো না বউজি, এই ঘরে আমিই একমাত্র পুরুষ, যে তোমার পাশে এমন করে আসতে পারে!"
দু’দিন আগে অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গিয়েছিলেন সানাম চৌধুরী। ফিরে আসার কথা ছিল আগামীকাল। রাত্রির বিস্ময় বাড়লো—
"এতো রাতে এলে? আমায় জানালে না কেন?"
সানাম হেসে বললো,
"তোমার কথা ভীষণ মনে পড়ছিলো। ভালোবাসায় কেমন যেন দমবন্ধ লাগছিলো। তাই চলে এলাম তোমার কাছে। জানো, তুমি একমাত্র নারী, যার জন্য আমি রাতের অন্ধকারে পথ পাড়ি দিতেও রাজি।"
"আমি তো শুধু ভালোবেসে আপনাকে বেঁধে ফেলেছি, সানাম ভাই। আমার এই ভালোবাসার বাঁধনে অন্য কারোর প্রবেশ নেই।"
সানাম চৌধুরী স্ত্রীকে বুকের মাঝে জড়িয়ে বললো—
"তোমার ভালোবাসার এই বাঁধন যেন কখনো না ছিঁড়ে যায়। যদি ছিঁড়ে যায়, তার আগেই মৃত্যু হোক আমার!"
"একদম বাজে কথা বলবেন না! আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি খাবার গরম করছি—"
সানাম চট করে রাত্রিকে নিজের কোলে বসিয়ে নিয়ে বললো,
"তুমি কি সত্যিই ভাবছো, আমি খাবারের জন্য এসেছি? আমি চাচ্ছি আমার প্রিয়তমার আদর-সোহাগ!"
লাজুক রাত্রির গাল লাল হয়ে উঠলো। মুখ ফিরিয়ে বললো,
"আপনি দিন দিন আরও বেশি অ'স'ভ্য হয়ে যাচ্ছেন, সানাম ভাই!"
"তোমার কাছে অসভ্য হতেই ভালো লাগে, জান। আজকে চল, নতুন অতিথি আনার ব্যবস্থা করি!"
রাত্রির মুখের রঙ যেন এক নিমেষে গোলাপি থেকে টকটকে লাল! এমন বেফাঁস কথায় যেন কেঁপে উঠলো তার সমস্ত শরীর। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো—
"প্লিজ চুপ করুন! আপনার কথা শুনে অস্বস্তি হচ্ছে।"
সানাম হেসে বললো—
"তোমার এই লজ্জা আমাকে পাগল করে তোলে, জান! ঠিক পাঁচ মিনিট এভাবে থাকো আমার বুকে, এরপর ঘুমোতে দেবো। আজ শরীরটা বেশ ক্লান্ত। দু’দিন তোমায় ছাড়া ঘুমই হয়নি।"
রাত্রিও শান্ত হলো। নিজেও অনুভব করছিলো সেই মুহূর্তের প্রশান্তি। এক সময় স্বামীর কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সানাম সুখের ঘুমে তলিয়ে গেলো।
---
স্মৃতিচারণ—
এই মেয়েটা তার হৃদয়ের বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। বড় ফুপির একমাত্র মেয়ে রাত্রি—যাকে প্রথম দেখাতেই মনে গেঁথে ফেলেছিলেন সানাম চৌধুরী। তখন রাত্রি ছিলো মাত্র পনেরো বছরের কিশোরী, আর সানাম ঊনত্রিশ। বয়সের ব্যবধান বুঝে নিজেকে সামলে রেখেছিলেন বহুদিন।
প্রেমের সেই পরিণত দিনে ছোট বোন পায়েলের মুখে শুনেছিলেন,
“ভাইয়া, রাত্রি তো তোমায় অনেক পছন্দ করে।”
সেদিন আর মনকে বাঁধতে পারেননি সানাম। বাবার কাছে গিয়েই বলেছিলেন—
“বড় ফুপির মেয়েটা আমার লাগবে, বাবা!”
বাবা একটু থেমে বলেছিলেন—
“মেয়েটার বয়স এখনো কম, সময় হলে ঠিক বিবেচনা করবো।”
সানাম মৃদু হেসে বলেছিল—
“তাকে পেতে আমাকে যদি যুগ যুগ অপেক্ষা করতে হয়, তবুও আমি করবো!”
চলবে...
