একটা_বিকেল_আমায়_দিও
' তোর স্বামী আরেকটা বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে বাড়িতে। তুই কি এখনো থম ধরে বসে থাকবি? কিছুই বলবিনা? '
দাদী শাশুড়ীর কথায় নিজেকে ভাবনার দুনিয়া থেকে সড়িয়ে আনলো তাহিয়া। বেগুনী রঙের শাড়িতে ফর্সা মুখটা মলিন দেখাচ্ছে তাহিয়ার তার উপর কান্না করার ফলে চোখের জল গুলো মুক্তর দানার মতো জ্বল জ্বল করছে দুই গালে। তাহিয়া নিজেকে শক্ত করে জিজ্ঞেস করলো,
'কাকে কি বলবো দাদী? কে শুনবে আমার কথা? তোমার নাতী শুনবে? '
তাহিয়ার দাদী শাশুড়ী বয়স্ক মহিলা এবার তাহিয়ার পাশে বসে ওর ডান হাত নিজের হাতের তালুতে নিয়ে বললো,
'তুই না ভালোবেসে বিয়ে করেছিলি আমার দাদুভাইকে? তাহলে কেন তোর কথা শুনবেনা? '
তাহিয়া ওনার চোখের দিকে চেয়ে জবাব দিলো,
'ভালোবাসা শেষ হয়ে গেছে দাদী। তাই তোমার দাদুভাই আমাকে রেখে অন্য একটা মেয়েকে আজ বিয়ে করে বউ বানিয়ে নিয়ে এসেছে। আমাকে কি বলেছে শুনবে? '
'কি বলেছে? '
'বলেছে এখানেই থাকবে? নাকি মায়ের বাড়ী গিয়ে থাকবে? তুমিই বলো দাদী? বিয়ের পর মায়ের বাড়ীতে গিয়ে থাকা যায়? লোকে কথা শুনাবেনা? আমার তো বাবা নেই আছে মা আর বোন ওদের সংসার চালাতে এমিনিতেই অনেক কষ্ট করতে হয়। তার মাঝে আবার আমি গিয়ে আমার ঝামেলা ওদের হাতে তুলে দেব? তার থেকে না হয় বাকী দিন গুলো এই বাড়ীতেই থাকলাম। '
তাহিয়ার দাদী শাশুড়ীর ভীষন মায়া হলো তাহিয়ার জন্য। আহারে! এই মেয়েটা বিয়ের পর থেকে এখানে এসে কম 'ক'ষ্ট তো সহ্য করেনি। প্রথমে শাশুড়ীর অ*ত্যা'চার এরপর ননদ-ননাসের অ*ত্যাচার আর সব শেষে স্বামীটাও এমন করলো? মেয়েটা এতো সব কিভাবে সহ্য করবে ?
তাহিয়া উঠে ঘরের দরজার কাছে দাঁড়ালো। ওর প্রিয় পুরুষটা আজ ওকে রেখে দ্বীতিয় বিয়ে করে বউ এনেছে অন্য এক নারীকে অথচ এই একটা মানুষের সাথে প্রেম এর সম্পর্ক ছিলো তিন বছর আর সংসার জীবনের চার বছর। কি কমতি ছিলো তাহিয়ার? শাশুড়ীর ইচ্ছে অনুযায়ী সামগ্রী আনতে পারতোনা বাবার বাড়ী থেকে আর.... একটা সন্তান না হওয়ার কারণ ।
তাহিয়া এখান থেকেই সদর দরজা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। যারা যারা মোহনের সাথে বিয়েতে গিয়েছিলো তারা সবাই ফিরে এসেছে। দ্বীতিয় বিয়ে বলে মানুষ দাওয়াত করেছে অল্প সং্খ্যাক। তাহিয়ার শাশুড়ী মিষ্টির প্লেট নিয়ে গিয়ে নতুন বউকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। মোহন ও পাশেই দাঁড়িয়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরে মাথা নিচু করে। পাশেই লাল শাড়ী পরিহিতা রমনী মাথায় লম্বা ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাহিয়ার বুকটা আবার ও আ*গ্নেয়গি*রির মতো জ্বলে উঠলো ভেতর থেকে। শুকনো গালের উপর আবারও বৃষ্টি ঝপঝপিয়ে নামলো নয়ন নামের নদী থেকে। এর শেষ কোথায় তা জানেনা তাহিয়া।
তাহিয়ার আর দেখার সাহস/শক্তি কোনোটাই হলোনা দাদী শাশুড়ীর ঘরের দরজা দুই হাতে শব্দ করে বন্ধ করে দিলো। যার শব্দে সদর দরজায় দাড়াঁনো কয়েক জোড়া মানুষের চোখ এদিকে এসে আটঁকালো।
******
সারা রাত না ঘুমানোর ফলে চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে তাহিয়ার। সকাল সকাল উঠে দাদী শাশুড়ীর রুম থেকে বের হয়ে বাসার এক্সট্রা ওয়াশ রুমে গেলো ফ্রেশ হতে। বাইরে এসে নজর পড়লো মোহনের রুমের দিকে যে রুমটায় গত চার বছর ওর আর মোহনের কত খুনশু টি না চলছিলো আর আজ? সে রুমের বাইরে মোহন ভেতরে অথচ অন্য একটা মেয়েকে বুকে নিয়ে দিব্য ঘুমিয়ে আছে। আচ্ছা মোহন কি করে পারলো ওকে রেখে আরেক নারীতে মগ্ন হতে? ওর কি তাহিয়ার কথা মনে আসেনি? মনে হয়নি.? প্রথম দিনের কথা গুলো ? হাতে হাত রাখার কথা গুলো? স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষ এভাবে পর হয়ে যায়? ওর আবার ও দু চোখ জলে ভড়পুর হলো । এর মাঝেই ওর বড় ননদিনী মাহির আগমন হলো সেখানে। তাহিয়াকে দেখতে আদেশ দিলো,
'এখানে দাঁড়িয়ে কি দেখছিস? যলদি যা সকালের নাস্তা তৈরি করা শুর কর। নতুন বউ এসেছে বাসায় সে খেয়াল আছে? আর বেনী খালা কই? তাকেও বল হাতে হাতে সব কাজ করে নিতে। '
তাহিয়া মাহির সব কথা শুনে চলে গেলো রান্নাঘরের উদ্দেশ্য। কাজের খালা সকাল সকাল উঠেই রান্না শুরু করে দিয়েছে তাহিয়াকে দেখে তিনি মুখ নামিয়ে হাতের কাজে মন দিলো। তাহিয়া এসে রুটি বানানোর সব পয়াম গুছিয়ে নিচ্ছিলো তখন বেনী খালা বললো,
'বউমা! আজকের একটা দিনেও তুমি রান্না করতে এসেছো? একটুও নিজের ভালো দিকটা ভাবলানা কোনো দিন ও? এই বাড়ীর একটা লোক ও তোমায় সহ্য করেনা কেউ নেই এখানে তোমার।
আমার খারাপ লাগে বউমা তোমার জন্য!. কেউ তোমার আপন হইলোনা এই বাড়ীর । '
'ওসব কথা ছাড়ো। আমার আসলে এখানে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আমি কার কাছে যাবো বলো? আমার তো বাবা নেই! মা আছে ঘরে ছোটো বোন আছে। যদি আমি তাদের কাছে চলে যাই সমাজ আমায় থুতু দিবে। আমার বোনের ভালো ঘরে বিয়ে হবেনা। মা নিজেও আমার সহ পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাবে। আমার প্রিয় মানুষ তো আমার কথা একবার ও ভাবেনি খালা। যার হাত ধরে চলে এলাম সে ও আমায় মনে রাখেনি! তাও তার ঘর ছাড়া আমার আর যাওয়ার যোগ্য স্থান নেই এই মহা বিশ্বে। কি দুর্ভাগ্য আমার হায়!'
'আমি বলি কি তুমি না হয়,আমার.....'
'আম্মা আসছে। চুপ করো খালা এসব শুনলে তোমায় রাখবেনা কাজে। '
বেনী চুপ হয়ে নিজের কাজ করতে লাগলো। তাহিয়ার শাশুড়ী অনিতা আসছে রান্না ঘরের দিকে মহিলা বেশ কড়া(শক্ত)প্রকৃতীর এই বাড়িটা ন'রকে রুপান্তরের সম্পুর্ন ক্রেডিট তার। তারপর আছে তার দুই মেয়ে মাহি আর মুনিয়া দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও মাসের পর মাস বাবার ঘরে এসে পড়ে থাকে। অনিতার দুই মেয়ে, দুই ছেলে। ছোটো ছেলে মুহিব যে বর্তমানে শহরের বাইরে আছে নিজের চাকরির সুবাদে। আর সেই অবর্তমানের সুযোগ নিয়েই ছোটো ছেলেকে না জানিয়ে বড় ছেলের ২য় বিয়ের আয়োজন করেছে অনিতা আর তার স্বামী মজনু আহ্মেদ।মুহিব মোহনের সহোদর ভাই হলেও সম্পুর্ন ব্যাক্তিত্ব আলাদা। মুহিব রা'গচটা, গম্ভীর আর ভয়ংকর। অনিতা মনে করে তার ছোটো ছেলে একদম ন্যায় আর সত্যর পথে চলার চেষ্টা করে সব সময় তার মায়ের সহ পরিবারের বাকীদের ভুল ভ্রান্তি গুলো নিজ হাতে ধরিয়ে সামনে নিয়ে আসে।
এই যে তাহিয়াকে নিয়েই মুহিবের বক্তব্যর শেষ নেই। মুহিব মনে করে তাহিয়ার না সমস্যা হয়তো মোহনের ও হতে পারে বাচ্চা না হওয়ার পেছনে। কিন্তু অনিতা আর তার ছেলে সেই কথা মানতে নারাজ। আবার তাহিয়ার উপর জুলুম করার কথাও একবার মুহিবের কানে গেছিলে সেই দিন মা বাবাকে নানা রকম কথা শুনিয়েছে এরপর যা করার তা করেন মুহিবের আড়ালে। একবার যখন বিয়ে হয়ে গেছে মুহিব জেনেও এখন আর এই বিয়ে অস্বিকার করতে পারবেনা। আর অনিতা এবার ছেলের বউ এনেছেন ও বেশ নাম, প্রতিপন্ন ঘরের মেয়ে।
তাহিয়া শাশুড়ীকে আসতে দেখে মাথার কাপড় ঠিক করলো। অনিতা এসে চায়ের কাপ নিতে নিতে বললো,
'বেনী! ওই অলক্ষ্মী কে বলে দে, কিছুতেই যেনো আজ আমার ছেলের বউয়ের সামনে সে না যায়! না জানি আবার নজর লেগে যায়! আপদ একটা! '
বলেই তিনি বেড়িয়ে গেলেন চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে।
চলবে
একটা_বিকেল_আমায়_দিও
[১]
মিশকাতুল_জান্নাত
