জীবনে প্রথমবারের মত আজ সকালে ইরিত্রা আমাকে কল করেছিলো। কল পেয়ে আমি ছুটে আসলাম। এরপর ও বলল বিয়ের কথা। আমি প্রাঙ্ক ভেবে রাজী হলাম। তারপর কীভাবে কীভাবে যেন সত্যি বিয়ে হয়ে গেল




ইরিত্রার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। এই অতি কাঙ্ক্ষিত মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য আনন্দিত হবো নাকি এই আকস্মিক বাঘের থাবার মত বিয়ে নিয়ে বিস্মিত হবো, না দুই পরিবারের কি প্রতিক্রিয়া হবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তা করবো–এসব অনুভূতি মিলিয়ে আমি এই মুহূর্তে সত্যি ছাগলের মতই বসে আছি।






আসাদকে দেখলাম মিষ্টি নিয়ে এসেছে। ইরিত্রা মিষ্টির প্যাকেট খুলে খুবই প্রফুল্ল মেজাজে একটা মুখে ঢুকালো। এরপর আমার দিকে একটা মিষ্টি বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,




-হিমেল সাহেব মিষ্টি খাবেন নাকি আপনার জন্য কাঁঠাল পাতা আনাবো?




-এখানে কাঁঠাল পাতা কোথায় পাবে? আপাতত মিষ্টিই খাই।




আমার মিষ্টি খাওয়া শেষ না হতেই ইরিত্রা ব্যস্ত গলায় বলল,




-আমার ক্লাস আছে। আসি।




রাজীব আর আসাদ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওরা এই কাণ্ডকীর্তি কিছুই বুঝতে পারছে না। ওদের পাশাপাশি নিজেও বুঝতে পারছি না!




ইরিত্রাকে বললাম,




-দাঁড়াও! কোথায় যাচ্ছো? আমি বাইকে করে পৌঁছে দিয়ে আসি।




ও মুখ ঝামটা মেরে বলল,




-নো নিড! বিয়ে নিয়ে অনেক নাটক করছেন। কাজী অফিস পর্যন্ত এসে বেঁকে বসেছেন। এরপর আবার কবুল বলতে সাত ঘন্টা লাগিয়েছেন। মনে হয়েছে আমি আপনার গলায় ছুরি ঠেকিয়েছি বিয়ের জন্য! ওদিকে আমাকে গায়ের শার্ট খুলে দিয়ে আসেন। পায়ে জুতা পরিয়ে দেন। ফুলের মালা কিনে দেন। ভাঁওতাবাজি যত।




এই বলে ইরিত্রা হনহন করে বের হয়ে রিক্সা নিয়ে চলে গেল। আমি আরো কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম।




জীবনে প্রথমবারের মত আজ সকালে ইরিত্রা আমাকে কল করেছিলো। কল পেয়ে আমি ছুটে আসলাম। এরপর ও বলল বিয়ের কথা। আমি প্রাঙ্ক ভেবে রাজী হলাম। তারপর কীভাবে কীভাবে যেন সত্যি বিয়ে হয়ে গেল। এবং ইরিত্রা মিষ্টি খেয়ে ভার্সিটিতে চলে গেল! আপাতত শুধু এইটুকুই বুঝতে পারছি। ওর কেন আজকের মধ্যে বিয়ে করা দরকার ছিলো কিংবা এরপর কী হবে কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছে না।




খালি পেটে এই কাণ্ড হলে সত্যি মাথা ঘুরে পড়ে যেতাম। চা আর পাউরুটি খেয়ে ভালো হয়েছে। রাজীব আর আসাদ দারুণ বিস্মিত হয়ে আমাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে চলেছে। আমি ওদের বললাম,




-এসব কি হলো আমি জানতে পারলে তোদেরও জানাবো।




আজ আমার একটা ভাইভা আছে। দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই মুহূর্তে আমার মস্তিষ্ক একটু কম কাজ করছে। আমি ওখান থেকে ভাইভা দিতে গেলাম।




ভাইভা দিয়ে বের হয়ে ইরিত্রাকে ফোন দিলাম। ও বিয়ে শেষে মিষ্টি খেয়েই আমাকে ফেলে ওভাবে চলে গেল। এখন আমি কী করবো? ও ফোন ধরে বলল,




-ডোন্ট ওয়ারী হিমেল সাহেব। আমাকে বিয়ে করে ঠকেননি। যান বাসায় যান। গিয়ে দুপুরের খাবার খান। পরে সাক্ষাৎ করবো আপনার সাথে। ক্লাস চলছে!




আমি বাসায় আসি। ইরিত্রা আমার বউ! ইরিত্রা! আমাদের বিয়ে হয়েছে! কী পরম আশ্চর্যজনক! কী বিস্ময়কর! অবিশ্বাস্য! আনন্দে আত্মহারা হয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মত বিষয়!




অজ্ঞান না হলেও আমি অস্থির হয়ে ব্যালকনির চেয়ারে বসে সিগারেট ধরালাম। সিগারেট আমি খুব একটা খাই না। কিন্তু এই মুহূর্তে দরকার।




মায়ের গলা শুনতে পেলাম। খাবার জন্য ডাকছেন। আমি দরজা না খুলেই বললাম, পরে খাবো। মা সিগারেটের গন্ধ পেলে আবার ঝামেলা! তবে এই ঝামেলা তো সামান্য ব্যাপার! বিয়ের ঝামেলা কীভাবে সামলাবো! আমি আরেকটা সিগারেট ধরালাম!




দ্বিতীয় সিগারেটটা শেষও করতে পারলাম না। এর ভিতর বিকট চিৎকারের শব্দ শুনতে পেলাম। মায়ের গলা। কি হলো? আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে দরজা খুলে সেদিকে যেতে উদ্যত হতেই রিপা ছুটে এসে বলল,




-ভাইজান কই যান? খালাম্মায় ছুরি লইয়া আইতাছে। আপনে নাকি ইরিত্রা আপারে বিয়া করছেন।




মাই গড! এই খবর ফাঁস হয়ে গেছে! কিন্তু কীভাবে? আমি দ্রুত রুমে ঢুকে দরজা আটকে দেই।




আমার ফোন অনবরত বেজে চলেছে। তিন বোন আর তিন দুলাভাই মিলে ক্রমাগত কল দিয়ে যাচ্ছে। বেশি দিচ্ছে বড় আপা। তার মানে বিয়ের ঘটনা সত্যি ফাঁস হয়েছে। আমি ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলাম।




কিন্তু ব্যাপারটা জানাজানি হলো কীভাবে? ইরিত্রা না বললে তো জানার আর উপায় দেখছি না। ও আমার সাথে আলাপ আলোচনা না করেই এটা ফাঁস করে দিয়েছে! ও কেন কী করছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না!




অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসা নীরব হয়ে গেল। মায়ের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। আব্বাও বাসায় আছেন। তিনি ডাক চিৎকার করার মানুষ না। তবে এত দ্রুত মায়ের থেমে যাওয়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা একেবারেই না। ব্যাপার কী?




রিপা অস্থির গলায় আবার দরজায় কড়া নেড়ে বলল,




-ভাইজান বাইর হন। সর্বনাশ তো আরেকখান হইছে।




আমি দরজা খুলতেই ও বলল,




-খালাম্মার তো প্রেশার বাইড়া অবস্থা খারাপের দিকে। তারে হাসপাতালে নিয়া গেছে। আপনেরে রামছাগল বলা মাইয়ারে কি দরকার ছিলো আপনের বিয়া করোনের!




আমি হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে গেলাম। দরজা বন্ধ করে বসে থাকবো আর কতক্ষণ! গিয়ে দেখি মা অতিরিক্ত রাগে অস্থির হয়ে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছেন। তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। আব্বা তার পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। মেঝো আপা আর সেজো আপা ইতোমধ্যে চলে এসেছেন। বড় আপাও নিশ্চয়ই কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবেন।




আমাকে দেখেই মায়ের রাগ বিস্ফোরিত হলো। ক্রোধ ভরা গলায় চিৎকার করে বললেন,




-টাকলার বাচ্চা বিয়ে করছিস কর। একটা মেয়ে বিয়ে করতে পারলি না! এই বিয়ে টিয়ে ভাঙ। নয়ত তোকে আমি ত্যাজ্য পুত্র করবো।




আব্বার মাথায় বিশাল টাক রয়েছে। মা অত্যাধিক রেগে গেলে সেটাকে গালি হিসেবে ব্যবহার করে। আমি নিচু গলায় বললাম,




-ইরিত্রা কি ছেলে?




মা চূড়ান্ত ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,




-হেনার বাপ ও আমার চোখের সামনে এসেছে কোন সাহসে! আবার আমার মুখে মুখে কথা বলছে। হাউ ডেয়ার হি হেনার বাপ! আরে আমার ছুরি কোথায়?




উত্তেজিত হয়ে মা বেড থেকে উঠে আমার একটা ব্যবস্থা করতে চাইলেন। কিন্তু আব্বা তাকে ধরে রাখলেন। এই মুহূর্তে খুশির ব্যাপার হলো মায়ের হাতে ছুরি নেই।




-হেনার বাপ তোমার পিস্তলটা কোথায়? ওর মাথা বরাবর গুলি চালাচ্ছো না কেন?




দুই বোন মিলে আমাকে ধিক্কার দিতে থাকলো। আব্বা ভারী গলায় বললেন,




-হিমেল, গেট আউট ফ্রম হিয়ার। এই কাজ করার কোনো মানে ছিলো না। তোমার মত ছেলের কাছে এসব আশা করা যায় না!




আমাকে চোখের সামনে দেখলে মায়ের রাগ ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। আমি ওখান থেকে বেড়িয়ে আসলাম। একটা টংয়ের দোকানে বসে সিগারেট ধরালাম। আজকে সিগারেট খাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই।




ইরিত্রাকে কয়েকবার করে কল দিলাম। ও ফোন তুলছে না। বড় আপা, দুলাভাই এখনো হাসপাতালে আসেননি কেন? ওই বাসায় কী কোনো ঝামেলা হচ্ছে? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন, ইরিত্রা এভাবে বিয়ে কেন করলো? কত সহজ ভাবে! বিয়ের মত সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে ও যেন পুতুল বউ খেললো। আমি না হয় ওকে পছন্দ করি, ভালোবাসি। ওর জন্য পাগল। কিন্তু ওর দিক থেকে তো কখনো কিছু ছিলো না। ও আমাকে এত নির্দ্বিধায় বিয়ে কীভাবে করলো!




মা যতটা রাগী মানুষ, আব্বা ততটাই ঠাণ্ডা মেজাজের। এই বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে তিনি বড়জোর দুই-চার দিন গম্ভীর হয়ে থাকবেন। ভারী গলায় কথা বলবেন। এছাড়া আর কিছু তিনি করবেনও না, বলবেনও না।




মায়ের খবর জানতে একমাত্র আব্বার কাছে ফোন দিতেই সাহস হলো। তিনি যথারীতি ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন,




-ফোন দিয়েছো কেন তুমি?




-মায়ের কী অবস্থা এখন? রাগ কমেছে? প্রেশার ঠিক হয়েছে?




-হ্যাঁ কমেছে। তুমি এখন গিয়ে আরেকটা হাঙ্গা করো বাজান।




-না, আব্বা। আর করবো না। একটা করেই যে দৌড়ের উপর আছি।




-দৌড়ের উপরই থাকো। তোমার মায়ের নাগালে এসো না। কিন্তু তুমি এভাবে বিয়েটা কেন করলো?




-এভাবে বিয়েটা যে কেন হলো আমি নিজেও এখনো জানি না আব্বা। জানলে তোমাকে জানাবো।




আব্বা হতাশ গলায় বললেন,




-আমার সবসময় গর্ব হতো বাজান। এরকম ট্যালেন্ট, ইন্টেলিজেন্ট, হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ছেলে আমি জন্ম দিয়েছি! কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আমিই একমাত্র মানুষ যে একটা গাধা জন্ম দিয়েছি।




এই বলে আব্বা ফোন রেখে দিলেন। একে তো বাসার এই গণ্ডগোল! তার উপর বিয়েটা করেই ইরিত্রা লাপাত্তা। যাক, আরেকটা সিগারেট ধরাই।




****

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী




যারা হাস্যরসাত্মক, রোমান্টিক গল্প পড়তে পছন্দ করেন এই ইবুকটা তাদের জন্য। পড়ুন বইটই থেকে।




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url





sr7themes.eu.org
How To Get It For Free?

If you want to get this Premium Blogger Template for free, simply click on below links. All our resources are free for skill development, we don't sell anything. Thanks in advance for being with us.